ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান গণ-আন্দোলনগুলো থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। কেবল সরকার পরিবর্তন কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অগ্রাধিকারমূলক পরিবর্তন এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা অংশগ্রহণমূলক সংগঠনের সক্রিয়তা।

গত শনিবার সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ‘বৈশ্বিক গণ-আন্দোলনের অভিমুখীনতা’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘যৌথ পাঠ ধ্রুপদি সাহিত্যের পাঠচক্র’ এই সেমিনারের আয়োজন করে। গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদারের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক সৈয়দ নিজার এবং পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়ী বক্তব্য রাখেন।

আলোচনা সভায় আলতাফ পারভেজ উল্লেখ করেন যে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান আন্দোলনগুলোকে শুধুমাত্র তারুণ্যের বিদ্রোহ হিসেবে দেখা ভুল হবে। এর গভীরে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ, সংগঠকদের নিরলস সংগ্রাম এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অগ্রাধিকার পরিবর্তনের জোরালো দাবি। তিনি বলেন, “আবাসন, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন ও সরকারি শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ না করে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন, ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শ্রমজীবী মানুষ, ভাড়াটিয়া, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব শ্রেণির মানুষের অসন্তোষ থেকেই আন্দোলন বিস্তৃত হচ্ছে।”

আন্দোলনের অন্য একটি দিক বিশ্লেষণ করে আলতাফ পারভেজ বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বিরুদ্ধেও মানুষ সোচ্চার হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অগ্রাধিকার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ, সরকার পরিবর্তন হলেও যদি বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তবে সাধারণ মানুষের সমস্যার কোনো সমাধান হয় না।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আলতাফ পারভেজ বলেন, দেশের গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার ও সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলেও শ্রমজীবী মানুষের আবাসন, গণপরিবহন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি। অথচ এসব সংকট বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও প্রকট। এর কারণ হিসেবে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, “বাংলাদেশের অধিকাংশ সংগঠন এখনো ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বা ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের মানুষের সমস্যা ও দাবি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এজেন্ডায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।” বিপরীতে ইউরোপের বিভিন্ন আন্দোলনে স্থানীয় সংগঠন ও কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণে আন্দোলনের কর্মসূচি এবং দাবিগুলো নির্ধারিত হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানা ইউরোপের আন্দোলনগুলোর অভিন্ন কারণ হিসেবে নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতি, যুদ্ধের ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় সংকোচনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এসব নীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর। তাই আন্দোলনগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংকটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে মোশাহিদা সুলতানা বলেন, শ্রমজীবী মানুষ আবাসনের পেছনে আয়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় করছেন। অথচ তাঁদের আবাসনসংকটসহ মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে কার্যকর আন্দোলন গড়ে উঠছে না। এ ক্ষেত্রে বামপন্থী সংগঠনগুলোকে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যা ও প্রয়োজনের কাছাকাছি যেতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়ী বলেন, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার গণ-অভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এসব অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক ফল প্রত্যাশা পূরণ না করলেও ভবিষ্যতের আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করে। তবে পুরোনো ব্যবস্থা ভাঙার পাশাপাশি নতুন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, মানুষ শুধু অর্থনৈতিক দাবি নয়, রাষ্ট্র ও সমাজে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যও আন্দোলন করে। ফ্রান্সের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সংহতির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংহতি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

নেপাল ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অর্ক ভাদুড়ী সতর্ক করে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে পুরোনো ব্যবস্থা নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। তাই রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করতে হবে। বহুত্ববাদী সমাজে সব শ্রেণি ও মতের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।