দেড় বছর বয়সী পিবির চাকমা তীব্র অপুষ্টির শিকার, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সিভিয়ার অ্যাকুইট ম্যালনিউট্রিশন বা স্যাম। গত আগস্ট মাসে তাকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তবে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা শেষ করার আগেই পাঁচ দিন পর তাকে বাড়ি ফিরে যেতে হয়।
পিবিরের মা সোনিয়া তঞ্চঙ্গ্যা এই অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বলেন, ‘ডাক্তার আরও কয় দিন থাকতে বলছিল। কিন্তু আমার কাছে টাকাপয়সা নাই। ওখানে থাকতে তো খরচ আছে। খাবার কিনতে হয়। আর বাড়ি থেকে আসা-যাওয়ায় হাজার টাকা লাগে।’
গত ২৯ সেপ্টেম্বর সোনিয়ার সঙ্গে কথা হয়। তিনি রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। সোনিয়াদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। তাঁর স্বামী রাজু চাকমা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন, তবে সেই কাজ সব সময় থাকে না। বর্তমানে দুই সন্তানসহ সোনিয়া তাঁর ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুস্থ সমবয়সীদের তুলনায় তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি ১১ গুণ বেশি।
অনুরূপ পরিস্থিতি তবলছড়ির বাসিন্দা আয়েশা বেগমের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। তাঁর চার বছর বয়সী ছেলে রাকিব হোসেন প্রথমে জ্বর নিয়ে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তাঁর হাম এবং নিউমোনিয়া শনাক্ত হয়। পরবর্তীতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর পুনরায় রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ২৭ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকরা জানান, রাকিব তীব্র অপুষ্টির শিকার এবং তাকে আরও কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হবে।
আয়েশা তাঁর কষ্টের কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমার স্বামী আরেক সংসার নিয়ে আলাদা থাকে। আমি ছেলেকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে থাকি। ২৫ হাজার টাকা কর্জ করে চিটাগাং গেছি, আবার কয় দিন আগেও চার হাজার টাকা ধার করছি। জানি না আরও কত দিন হাসপাতালে থাকতে হবে।’
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০১৯ এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির হার ছিল ১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, সুস্থ সমবয়সীদের তুলনায় তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি ১১ গুণ বেশি।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী দক্ষিণ বাজারের বাসিন্দা শিরিন আখতারের পাঁচ সন্তান। সবার ছোট ফাইজা ইসলাম জুবাইদা (২) সম্প্রতি তীব্র অপুষ্টির কারণে বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। তবে হামের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় শিরিন মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। তাঁর স্বামী জহিরুল ইসলাম স্থানীয় বাজারে ফুচকা বিক্রি করেন।
পারিবারিক বাধ্যবাধকতার কথা জানিয়ে শিরিন বলেন, ‘বড় মেয়েটা ওখানে (মাদ্রাসা) চলে যায়। দেখেন ছেলেটার জ্বর, অসুস্থ। আর স্বামীর সংসারের মইদ্যেও কাজ আছে। এগুলার লাই থাকতে পারি না।’ তিনি আরও জানান, প্রতিদিন ফুচকা তৈরির সামগ্রী প্রস্তুত করতে হয় তাঁকে, তাই সংসার ছেড়ে হাসপাতালে থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৬ জন তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। ওই কেন্দ্রের চিকিৎসক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, অধিকাংশ অভিভাবকই বিভিন্ন কারণে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘ সময় থাকতে চান না।
সাধারণত জটিলতাসহ তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুদের প্রায় দুই সপ্তাহ হাসপাতালে রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে অধিকাংশ অভিভাবক এই দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান এড়িয়ে চলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিএইচআইএস-২ অনলাইন তথ্যভান্ডারের তথ্যমতে, গত বছর দেশে মাত্র ২১ হাজার ৩৬টি তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
নোয়াখালীর সিভিল সার্জন আনোয়ার হোসেন জানান, নদীভাঙনের কারণে ওই অঞ্চলের অনেক মানুষ ক্রমাগত বসতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, যা তাদের খাদ্যনিরাপত্তাকে ব্যাহত করে। তিনি বলেন, ‘কিছু মাইগ্রেটিং পরিবার আছে। নদীভাঙন আছে, ঝড় আছে। এরা আজ এখানে, কাল ওখানে। হাতিয়া, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ এখানের একটা বড় অংশ (বাসিন্দা) স্থায়ী না। ফলে তাঁদের জীবিকা নির্দিষ্ট নয়। এতে তাঁদের শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তাটা ব্যাহত হয়।’
ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেইজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) এর সর্বশেষ (জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬) প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা বিভাগের ছয়টি জেলাকে মারাত্মক তীব্র অপুষ্টির সংকটজনক পর্যায় বা ফেজ ৪ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আকস্মিক বন্যা, হামের প্রাদুর্ভাব, শিশুদের অনুপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস এবং দুর্বল স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির কারণে এসব জেলায় পুষ্টি পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রাঙামাটি জেলার সিভিল সার্জন নূয়েন খীসা জানান, এই অঞ্চলের অপুষ্টির পরিস্থিতি অন্য জায়গার তুলনায় অত্যন্ত ভয়াবহ। তিনি বলেন, ‘অপুষ্টি এই জায়গাটাতে অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় খুবই ভয়াবহ। এখানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গতানুগতিক নয়। যাঁরা নীতিনির্ধারক আছেন, তাঁরা পার্বত্য এলাকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে পারেন।’ দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব এবং স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসকে তিনি এই সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
হাসপাতালে তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসায় থেরাপিউটিক মিল্ক এফ-৭৫ এবং এফ-১০০ ব্যবহৃত হয়, যা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপদ পানির সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করেন। তবে অনেক অভিভাবক আগেই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাওয়ায় চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্টরা কমিউনিটি-ভিত্তিক চিকিৎসায় জোর দেওয়ার কথা বলছেন।
ন্যাশনাল গাইডলাইনস ফর দ্য ফ্যাসিলিটি বেসড ম্যানেজমেন্ট অব চিলড্রেন উইথ সিভিয়ার একিউট ম্যালনিউট্রিশন ইন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিশুর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘দারিদ্র্যসীমার নিচে বা মাঝামাঝি যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে সাত দিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। দেখা যায়, প্রতিদিন তাঁদের কাজে যেতে হয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের এমন একটা রাস্তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন, যাতে আগেই কমিউনিটি লেভেলে এই চিকিৎসাসেবাটা আমরা নিশ্চিত করতে পারি।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জটিলতাহীন তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসায় রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (আরইউটিএফ) ব্যবহার করা হয়। এটি বাদাম, গুঁড়া দুধ, ভোজ্যতেল, চিনি এবং ভিটামিন-খনিজের একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ পেস্ট, যা সরাসরি প্যাকেট থেকে খাওয়ানো যায়। এর জন্য পানি বা রান্নার সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না, ফলে বাড়িতেই এটি দেওয়া সম্ভব।
গত ৩০ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে আরইউটিএফ ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করলেও সেখানে আরইউটিএফ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে বিশেষ অনুমোদনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের নিউট্রিশন চিফ কিরোস তেফেরা আবেবে ই-মেইলে মুক্তকণ্ঠকে জানান, আরইউটিএফ এফ-৭৫ ও এফ-১০০-এর বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী শারীরিক জটিলতাহীন শিশুদের জন্য এটি সুপারিশ করা হয়।
কিরোস আরও বলেন, ‘এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ এবং সহজে বহন করা যায়। এ কারণে দূরবর্তী এলাকা এবং সীমিত অবকাঠামোর জায়গাতেও এটি ব্যবহারের উপযোগী। এ ছাড়া এটি তৈরির জন্য পানির প্রয়োজন হয় না। ফলে পানি মিশিয়ে তৈরি করা খাবারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের যে ঝুঁকি থাকে, তা কমে যায়।’