শাসকের পরিবর্তন ঘটলেও রাষ্ট্রের ক্ষমতা-কাঠামোর কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। দলটির নেতাদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হিসেবে পুরোনো ক্ষমতা-কাঠামো ভেঙে অংশীদারত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে জেএসডি।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জেএসডির ৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই মত প্রকাশ করা হয়। সভায় ‘পুরোনো ক্ষমতা-কাঠামো বদলাও—অংশীদারত্বের গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্র রূপান্তর করো’ শীর্ষক আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারিত ছিল। পুরো অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব।
সভায় উপস্থিত হয়ে সাংবাদিক সোহরাব হাসান উল্লেখ করেন যে, শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার লড়াইয়ের অঙ্গীকার নিয়েই জেএসডির পথচলা শুরু হয়েছিল। তবে বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের কর্মসূচিকে সামনে আনা হচ্ছে, যা আদর্শিক অবস্থানের দিক থেকে এক ধরনের বিচ্যুতি বলে তিনি মনে করেন। তা সত্ত্বেও তিনি বলেন, "তবে এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই জনগণকে ক্ষমতায়িত করার লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।"
আইনজীবী এবং সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য শরীফ ভূঁইয়া তার বক্তব্যে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, জাতীয় সনদ এবং গণভোটের যে রায় এসেছে, এমনকি বিএনপির ৩১ দফায় যে অঙ্গীকার দেওয়া হয়েছিল, তার কোনোটিই কার্যকর করা হচ্ছে না। তার অভিযোগ, নির্বাচিত বিএনপি সরকার জনগণের কাঙ্ক্ষিত পথ কিংবা নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির পথে হাঁটছে না। ফলে সংবিধানের গভীর সংস্কারে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের যে ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছিল, তা হাতছাড়া হয়ে গেছে।
শরীফ ভূঁইয়া আরও জোর দিয়ে বলেন, "শাসনক্ষমতা ও রাষ্ট্রকাঠামো এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও অন্তত জনকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়। ক্ষমতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক না রেখে বিস্তৃত ও বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। রাষ্ট্রের তিন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার পৃথক্করণ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতা-কাঠামোর পরিবর্তন না হলে রাষ্ট্র আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষক হেলালুজ্জামান আহমদ তার বক্তব্যে বলেন, সংসদের উচ্চকক্ষে যদি বিকশিত সামাজিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়, তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমেই রাষ্ট্রের ক্ষমতা-কাঠামোতে একটি ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব হবে।
জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশে বারবার সরকার এবং শাসকের পরিবর্তন হলেও ক্ষমতার যে কেন্দ্রীভূত কাঠামো, তার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, "ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস হয়নি। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, সম্পদ বণ্টন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি।"
সবশেষে সভাপতির বক্তব্যে তানিয়া রব জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকার এবং গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় কার্যকর করার দাবি জানান। সেই সঙ্গে তিনি একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।