ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও লিকুদ পার্টির প্রধান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তীব্র বিরোধিতার মুখে তেল আবিবের রাস্তায় নেমে এসেছেন হাজারো মানুষ। পার্লামেন্ট নির্বাচনে মোট ৬৭টি আসন পাওয়া নেতানিয়াহু বিরোধী ইহুদি এবং আরব রাজনৈতিক দলগুলোর একজোট হয়ে একটি জোট সরকার গঠনের জোরালো দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।

গত শনিবার তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে প্রায় দুই হাজার মানুষের এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসময় আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে তাদের দাবি জানান। তাদের স্লোগানের মধ্যে ছিল—‘ইহুদি ও আরবরা একে অপরের শত্রু হতে চায় না’ এবং ‘বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, সম্প্রীতির পক্ষে’। বিক্ষোভকারীদের হাতে দেখা গেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধিতার কথা লেখা বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড।

হাবিমা স্কয়ার থেকে মিছিলটি রাবিন স্কয়ারে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বিক্ষোভকারীরা ঢোল বাজিয়ে তাদের প্রতিবাদ জানান এবং বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। সেই প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা ছিল, ‘পরিবর্তনের আনার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে’ ও ‘সবার জন্য সমতা’। এছাড়া তারা ‘অংশীদারত্ব ও সমতার মধ্য দিয়ে আমরা সরকার পরিবর্তন করব’—এমন স্লোগানও প্রদান করেন।

শুধুমাত্র তেল আবিবে নয়, ইহুদি ও আরব রাজনৈতিক দলগুলোর একীভূত হয়ে জোট সরকার গঠনের দাবিতে শনিবার জেরুজালেমেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’ নামের একটি গোষ্ঠী ইসরায়েলজুড়ে এই বিক্ষোভ কর্মসূচিগুলোর আয়োজন করেছে। একই দাবিতে গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের হার্জলিয়া শহরেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

উল্লেখ্য, গত ২৮ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো একক দল বা জোট পায়নি। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোট ৫৩টি আসন লাভ করেছে। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন এবং আরব দল রাআম ও জয়েন্ট লিস্ট যৌথভাবে ১৯টি আসন জিতেছে।

রাজনৈতিক সমীকরণে দেখা যাচ্ছে, আইজেনকটের জোট যদি আরব দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলায়, তবে তাদের পক্ষে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে সরকার গঠন করা সম্ভব। এই বিষয়ে নেতানিয়াহু বিরোধী ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর বৈঠকের খবরও পাওয়া গেছে। এমনকি ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।

এদিকে, ইসরায়েলের স্পিকার আমির ওহানাকে নতুন পার্লামেন্টের প্রথম দিনেই পদ থেকে সরানোর বিষয়ে নেতানিয়াহু বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক সেরি। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে বিরোধীদের নিজেদের মধ্যেই মতপার্থক্য বিদ্যমান। নেতানিয়াহু বিরোধী চারটি দলের মধ্যে তিনটি দল—ইয়াশার, বি’য়াচাদ ও ইসরায়েল বেইতেনু আরব দলগুলোকে নিয়ে জোট সরকার গঠনে আগ্রহী নয়। ফলে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন যুক্ত করলে সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৬৭ হলেও, বাস্তবে সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।

অন্যদিকে, শনিবার হাবিমা স্কয়ারে নেতানিয়াহুর প্রায় ২০০ জন সমর্থক পাল্টা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের দাবি, আরব দলগুলো নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে। এই বিক্ষোভকারীদের মুখে ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ এবং ‘সন্ত্রাসীদের গাজায় পাঠাও, সরকারে নয়’—এমন স্লোগান শোনা যায়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ বর্ণবাদী স্লোগান দিয়ে বলেন, ‘তোমাদের গ্রাম পুড়ে ছাই হোক।’

বিক্ষোভ চলাকালীন রাআম ও জয়েন্ট লিস্টের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। সেখানে উপস্থিত হয়ে বিদায়ী পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেন, ‘আমরা কাউকে নির্বাচন চুরি করতে দেব না।’ তাঁর পাশে থাকা একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ইহুদি রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের অধিকার আরবদের দেওয়া হবে না।’