দীর্ঘদিন স্থগিত থাকার পর অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশি কর্মীদের বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের অনুমোদিত হাসপাতালগুলোতে এই পরীক্ষা কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) থেকে দেশের অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারগুলোতে একযোগে এই কার্যক্রম চালু করা হয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি জনপ্রতি সর্বোচ্চ আট হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতে অবস্থিত গ্রীনল্যান্ড মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছে মুক্তকণ্ঠ। শনিবার সকাল থেকেই মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুক কর্মীদের ভিড়ে মেডিকেল সেন্টারটিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সকাল থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করে তৃতীয় তলায় সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করছেন বেশ কয়েকজন। কেউ কেউ তখনো রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেননি, আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এক রুম থেকে অন্য রুমে ছোটাছুটি করছেন।

জানা গেছে, এই সেন্টারে মালয়েশিয়ার পাশাপাশি দুবাই ও সৌদি আরবগামী যাত্রীরাও থাকায় ভিড় তুলনামূলক বেশি। তবে মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের জন্য এটি প্রথম দিন হওয়ায় কার্যক্রম কিছুটা ধীর গতিতে চলছে। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রায় ১০০ জনের রেজিস্ট্রেশন হলেও পরীক্ষা শেষ করতে পেরেছেন মাত্র ২৪ জন। কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছে যে, রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

অপেক্ষারত কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে পরীক্ষা করাতে এসেছেন। কাজের ধীরগতির কারণে অনেকেই নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শেষ করতে পারেননি, ফলে তারা আত্মীয়-স্বজনের বাসা বা হোটেলে থাকার পরিকল্পনা করছেন। তবে সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বগুড়া থেকে আসা লিমন নামের একজন কর্মী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমি সকালে এখানে এসেছি। এখনো আমার সিরিয়াল আসেনি। কাজ অনেক ধীরগতিতে হচ্ছে। যদি আজকে কাজ না হয় তাহলে আশপাশেই কোথাও থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে, এখানকার পরিবেশ ভালোই মনে হলো।”

অন্যদিকে, মাগুরা থেকে আসা মেহেদি হাসান জানান, “স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ যাওয়ার জন্যে সরকারিভাবে আবেদন করেছিলাম। একটা এজেন্সির মাধ্যমে এখানে এসেছি। সরকার মেডিকেল পরীক্ষার ফি ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখানেও সেটাই নিচ্ছে। কোনো কিছু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।”

গ্রীনল্যান্ড মেডিকেল সেন্টারে রক্ত পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং সংক্রামক ব্যাধির স্ক্রিনিং সম্পন্ন করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানরা। দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধ করতে কর্তৃপক্ষ বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে।

সেন্টারে দায়িত্বরত হোসেন আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সকাল থেকেই অনেক চাপ। প্রথম দিন হওয়ায় ভিড় একটু বেশি হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি যাতে কোনো ভোগান্তি না হয়।”

গ্রীনল্যান্ড মেডিকেল সেন্টারের ইনচার্জ নেহাল আহমেদ জানান, “এখানে এক্স-রে, ব্লাড টেস্টসহ যে-সব পরীক্ষা বাধ্যতামূলক সবগুলোই করা হয়। স্যাম্পল নেওয়ার পরবর্তী ২-৩ দিনের মধ্যেই আমরা রিপোর্ট দিয়ে থাকি। কোনো জটিলতা থাকলে ক্ষেত্রবিশেষে বেশি সময়ও লেগে যায়।”

তিনি আরও বলেন, “আজকে প্রথমদিন হওয়ায় খুব বেশি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অন্যান্য দেশেরও কাজ থাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চাপ ছিল। ফলে আমাদের জন্যে কাজ করতে একটু কঠিন হয়ে গেছে। কাজ একটু ধীরগতিতে হলেও ঠিকঠাক এগুচ্ছে।”

সার্ভারের সমস্যা প্রসঙ্গে নেহাল আহমেদ বলেন, “সার্ভারের সমস্যা হওয়ায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিতেও একটু সমস্যা হচ্ছিল। প্রথম দিন হওয়ার কারণেই এমন হয়েছে। আশা করছি, সামনে আরও দ্রুত কাজগুলো করতে পারব।”

উল্লেখ্য যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম এবং অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল মালয়েশিয়া সরকার। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর দুই দেশের সরকারের যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় পুনরায় এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা হয়।

নতুন চুক্তি ও কাঠামোর আওতায় মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ এবার বাংলাদেশের ২৫টি প্রধান রিক্রুটিং এজেন্সি ও ৩১২টি সহযোগী এজেন্সির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে।

এই শ্রমবাজারকে সম্পূর্ণ সিন্ডিকেটমুক্ত ও স্বচ্ছ রাখতে সরকার বেশ কিছু কঠোর নীতিমালা কার্যকর করেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবরের আগে করা কোনো মেডিকেল রিপোর্ট ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না। এছাড়া কর্মী নিবন্ধনের অনলাইন প্ল্যাটফর্‌ম ‘মাইগ্রামস’ স্লিপের জন্য কোনো ফি নেওয়া যাবে না। কোনো মেডিকেল সেন্টার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা দাবি করলে বা কর্মীদের হয়রানি করলে সরাসরি অভিযোগ জানানোর অনুরোধ করেছে মন্ত্রণালয়।

রাজধানী ঢাকার যে ১৭টি মেডিকেল সেন্টারে এই পরীক্ষা করা যাবে, সেগুলো হলো— এশিয়া ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সেন্টার লিমিটেড, ফেমাস স্পেশালাইজড হসপিটাল, গ্লোবাল মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, হিউম্যান ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সেন্টার, ইবনে ওমর মেডিকেল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আইডিয়াল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সেন্টার, জান্নাহ মেডিকেল সার্ভিসেস, ল্যাব সায়েন্স ডায়াগনস্টিক, লিডিং হেলথ চেক আপ লিমিটেড, পারফেক্ট মেডিকেয়ার লিমিটেড, পুষ্প ক্লিনিক, সানলাইট ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল লিমিটেড, মেডিনেট মেডিকেল সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড, ইউনিক্যার মেডিকেল সার্ভিসেস, ডায়নামিক ল্যাব ও গ্রীনল্যান্ড মেডিকেল সেন্টার লিমিটেড।