চলতি বছরের প্রথম নয় মাস দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ২ হাজার ৯০১টি ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০৯ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৭৯২ জন। একই সময়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬১৭ জন নারী ও শিশু, যাদের মধ্যে ৩৮৮ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু।

প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৪ জন এবং কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ৬৭ জনের। এছাড়া ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুল্ব ও নির্যাতনে নিহত হয়েছেন ১১ জন বাংলাদেশি নাগরিক।

নির্বাচনী সহিংসতার ভয়াবহতা তুলে ধরে অধিকার জানিয়েছে, এই নয় মাসে নির্বাচনী সহিংসতায় ১ হাজার ৩৮১টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৬৮ জন আহত হয়েছেন। গণপিটুনিতে নিহত ৭৪ জনের মধ্যে মে মাসে সর্বোচ্চ ১৩ জন এবং জুন মাসে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ধর্ষণের শিকার ৩৮৮ শিশু
অধিকারের হিসাব অনুযায়ী, ধর্ষণের শিকার হওয়া ৬১৭ জনের মধ্যে ৩৮৮ জন মেয়েশিশু এবং ২২৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। বাকি দুজনের বয়স সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২২ জন নারী নিহত হয়েছেন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৭ জন এবং ৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। পাশাপাশি নারীদের উত্ত্যক্ত করার ৩৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ১৬৯টি ঘটনা অধিকারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ৬৫টি ঘটনায় সাংবাদিকেরা আহত হয়েছেন, ২২ জন লাঞ্ছিত এবং ২৫ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা এবং ২১টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া পাঁচটি হামলা, একজন সাংবাদিকের গ্রেপ্তার এবং একজনকে নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুজন সাংবাদিক গুম হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

কারাগারে ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ বন্দী
দেশের কারাগারগুলোর করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে প্রতিবেদনে। দেশের ৭৫টি কারাগারে মোট বন্দী ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ১৫৭ জন। তবে গত ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব কারাগারে বন্দী ছিলেন ১ লাখ ৫ হাজার ১০২ জন, যা ধারণক্ষমতার আড়াই গুণেরও বেশি। এই নয় মাসে কারাগারে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে কারাগারে নির্যাতন, দুর্নীতি এবং অসুস্থ বন্দীদের হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১০ জন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন নির্যাতনে, দুজন পিটিয়ে এবং দুজন গুলিতে নিহত হয়েছেন। এছাড়া ২০০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তে বিএসএফের হাতে ১১ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। এছাড়া বাংলাদেশে ৫৬ জনকে পুশ ইন করার ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে বিএসএফের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মোট ৭৮টি ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গুম ও মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে উদ্বেগ
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অধিকার। সংগঠনটির মতে, আইনটির ১৪(৩) ধারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তবাহিনী তদন্ত দলকে দেওয়ার বিধান থাকায় নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আর ২১ ধারায় অভিযোগ আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনেও প্যারিস নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কমিশন নিজ উদ্যোগে তদন্ত করতে পারবে না।

এছাড়া র‍্যাব বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি থাকলেও গত ১৫ সেপ্টেম্বর সংসদে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন পাসের মাধ্যমে র‍্যাবের জনবল, সম্পদ, ক্ষমতা ও চলমান মামলাসহ বিভিন্ন বিষয় নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে অধিকার। সংগঠনটির মতে, এর ফলে র‍্যাবের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হওয়ায় বাতিল হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অধিকার। এছাড়া পুলিশে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।