সাধারণ বিনোদনকেন্দ্রের চেয়ে আলাদা অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে ওয়াওজা এন্টারটেইনমেন্ট মিউজিয়াম। এখানে কেবল প্রদর্শনী নয়, বরং গেম ও অ্যাক্টিভিটি সেগমেন্টের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে এক অনন্য জগৎ, যা একে অন্যান্য বিনোদনকেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

কল্পনা করুন, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু আপনার পায়ের নিচের মাটি নিজ থেকেই সরে যাচ্ছে। এই বিস্ময় নিয়ে যখন সামনে এগোবেন, ঠিক তখনই নিজেকে আবিষ্কার করবেন চাঁদের মাটিতে। এখানেই শেষ নয়, আরও কিছুটা সামনে যেতেই দেখবেন আপনার সামনে হুবহু আরও কয়েক জন আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। এই দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে আপনি হয়তো কোনো স্বপ্ন দেখছেন এবং এখনই আপনার ঘুম ভাঙবে। তবে এটি কোনো স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তব। এমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছে মিরপুর ১২ নম্বরে অবস্থিত নবপ্রতিষ্ঠিত চিত্তবিনোদনকেন্দ্র ওয়াওজা।

ওয়াওজা নিজেকে দাবি করে বাংলাদেশের প্রথম প্রিমিয়াম ইলুশন ও ইমারসিভ এন্টারটেইনমেন্ট মিউজিয়াম হিসেবে। এখানে অপটিক্যাল ইলুশন বা দৃষ্টিবিভ্রমের কৌশল ব্যবহার করে সব বয়সের মানুষের জন্য আকর্ষণ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব একটি ক্যারেক্টার রয়েছে যার নাম উজি। উদ্বোধনের মাত্র তিন মাস পার হতে না হতেই রাজধানীর মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাড়া ফেলেছে এই কেন্দ্রটি।

বেশ কয়েকজন তরুণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই উদ্যোগ। তারা বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সময় লক্ষ্য করেন যে থাইল্যান্ড ও নেপালের মতো দেশগুলোতে থ্রিডি আর্ট গ্যালারি কিংবা অপটিক্যাল ইলুশন মিউজিয়ামের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ কেন এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে? যদিও দেশে এখন এমন কিছু উদ্যোগ দেখা যায়, তবে উদ্যোক্তাদের মতে ওয়াওজা তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

এই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ওয়াওজার ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হৃদয় চৌধুরী জানান, ‘ওয়াওজা এমন একটি উদ্যোগ, যেখানে দুই-তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের মানুষ এসে উপভোগ করতে পারবে। সবার কথা মাথায় রেখে আমরা পুরো জায়গাটিকে অপটিক্যাল ইলুশন মিউজিয়াম, পারস্পেকটিভ আর্ট এবং গেমিং জোন—এমন বিভিন্ন সেগমেন্টে ভাগ করেছি।’

‘এক্সপেরিয়েন্স দ্য আনরিয়েল’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে গড়ে তোলা ওয়াওজাতে রয়েছে নানা চমক। এর মধ্যে কয়েকটি বিশেষ আকর্ষণ উল্লেখযোগ্য।

প্রথমত, ভর্টেক্স টানেল। এটি সম্ভবত ওয়াওজার প্রধান আকর্ষণ। পর্দাঘেরা একটি অন্ধকার ঘরে রয়েছে লম্বা এক সুড়ঙ্গ, যার চারদিকে লাল-নীল আলোর খেলা চলে। এই সুড়ঙ্গে পা রাখলেই মনে হয় পায়ের নিচের মাটি নড়ছে এবং পুরো সুড়ঙ্গটি গোল গোল ঘুরছে। আলোছায়ার খেলা আর অপটিক্যাল ইলুশনের মাধ্যমে তৈরি এই টানেলটি দর্শনার্থীদের অন্য এক জগতে নিয়ে যায়।

আরেকটি আকর্ষণ হলো শ্যাডো ড্যান্স। এখানে বড় স্ক্রিনে মাইকেল জ্যাকসন বা হাল্কের মতো পছন্দের ক্যারেক্টার বেছে নিতে হয়। এরপর ৩০ সেকেন্ড সময় দেওয়া হয়, যার মধ্যে আপনার অঙ্গভঙ্গিকে হুবহু অনুকরণ করবে সেই ক্যারেক্টারটি এবং তা স্ক্রিনেই দেখা যাবে। উদ্যোক্তাদের মতে, এই বিষয়টি দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

চাঁদের মাটিতে হাঁটার অনুভূতি পাওয়া যায় টিল্ট রুমে। কিছুটা বাঁকানো এই ঘরে প্রবেশ করলে অবিকল চাঁদে পা রাখার মতো অভিজ্ঞতা হয়। এই অভিজ্ঞতাকে আরও বাস্তবসম্মত করতে খুব শীঘ্রই নভোচারীদের পোশাক আনা হবে বলে জানিয়েছে ওয়াওজা কর্তৃপক্ষ।

দৃষ্টিভ্রমের আরও এক খেলা দেখা যায় অ্যামস রুমে। এই ঘরের দুই কোণে দাঁড়ালে একজনকে দৈত্যের মতো বিশাল আর অন্যজনকে খুব ছোট মনে হয়। বিশেষ করে দম্পতি, ভাই-বোন কিংবা বাবা-মায়ের জন্য ছবি তোলার জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি স্থান।

অন্যদিকে ক্যামোফ্লাজ রুমে প্রবেশ করলে মানুষ নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে যায়, কেবল দেখা যায় তার মুখ। দেয়ালের সাথে হুবহু মিলিয়ে যাওয়া বিশেষ পোশাক এবং চোখের ধোঁকার মাধ্যমে এই জাদু তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আয়নার জাদুতে এখানে নিজেকে অনেক সংখ্যায় দেখা যায়।

পুরো মিউজিয়ামের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় থ্রিডি এবং পারস্পেকটিভ ওয়াল আর্টস রয়েছে। ছবি তোলার জন্য এখানে বিশেষ ব্যবস্থা এবং সহায়তার জন্য নিয়োজিত আছেন কর্মী। রঙিন এক শহরের দৃশ্যটি দর্শকদের সবচেয়ে বেশি ধাঁধায় ফেলে, কারণ দূর থেকে দেখলে মনে হয় জীবন্ত শহরটি আপনার সঙ্গেই হাঁটছে।

মিরর মেইজের ক্ষেত্রেও ওয়াওজা ভিন্নতা এনেছে। এখানে শত শত প্রতিবিম্বের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেখা যাবে বিশাল এক সূর্যমুখীর বাগান এবং আলোর চমৎকার খেলা।

অ্যাক্টিভিটির পাশাপাশি এখানে রয়েছে ইন্টারঅ্যাকটিভ গেমস। ছোট-বড় সবাই এখানে লাল-নীল ব্লকের খেলা এবং নাটাই দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর ভিডিও গেম উপভোগ করছেন। এক কথায়, ইনডোর ও আউটডোর গেমসের সব অনুভূতি পাওয়া যাচ্ছে এক ছাদের নিচেই।

টিকিট ব্যবস্থা প্রসঙ্গে জানা গেছে, একজনের প্রবেশমূল্য ৫০০ টাকা, যার সাথে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। প্রতিটি পাসের জন্য সময় নির্ধারিত থাকে এক ঘণ্টা। এটি একটি স্লটভিত্তিক টিকিট সিস্টেম, যার ফলে এক ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো অ্যাক্টিভিটি ও গেম যতবার ইচ্ছা উপভোগ করা যায়। সিঙ্গেল পাসের পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন প্যাকেজের সুবিধাও রয়েছে।

প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে এই কেন্দ্রটি। মিরপুর ১২-এর হাজী কুজরাত আলী মোল্লা মার্কেটের ৪র্থ তলায় ওয়াওজার অবস্থান।