একসময় নিয়মিত ধূমপান এবং মদ্যপানের প্রবল আসক্তি ছিল তাঁর জীবনে। অথচ বর্তমানে তাঁকে দেখলে মনে হবে, শারীরিক সুস্থতা বা ফিটনেস যেন তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বয়সকে যেন সম্পূর্ণভাবে হার মানিয়েছেন ভারতীয় অভিনেতা ও মডেল মিলিন্দ সুমন। তবে তাঁর বর্তমান এই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সব সময় এমন ছিল না। জীবনের এক বিশেষ পর্যায়ে তিনি ধূমপান ও মদ্যপানের নেশায় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে তাঁকে। সম্প্রতি নিজের জীবনের সেই অজানা ও অন্ধকার অধ্যায়ের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন এই অভিনেতা।

গত ৩০ অক্টোবর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত 'ইন্ডিয়া টুডে হেলথ ওয়েলথ সামিট'-এ অংশ নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা করেন অভিনেতা। সেখানে তিনি নিজের অতীত, আসক্তি থেকে মুক্তির লড়াই এবং ফিটনেস নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি জানান, প্রায় ২৫ বছর আগে তিনি ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন এবং মদ্যপানের অভ্যাস থেকেও সফলভাবে বেরিয়ে এসেছেন।

মডেলিং পেশায় আসার পর বদলে যায় মিলিন্দ সুমনের জীবন। তাঁর শুরুর জীবনটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র ৯ বছর বয়স থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক সাঁতার ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি নিয়মিত কঠোর অনুশীলন করতেন এবং সপ্তাহে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার সাঁতার কাটতেন। নিজের ইভেন্টে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।

কিন্তু মডেলিংয়ের একটি প্রস্তাব পাওয়ার পর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সে সময় মডেলিং যে একটি পেশা হতে পারে, সে সম্পর্কে তাঁর তেমন ধারণা ছিল না। তবে পারিশ্রমিক আকর্ষণীয় হওয়ায় তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন। এরপরই তিনি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের সঙ্গে পরিচিত হন। সাঁতারের সেই অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল জীবনের বাইরে তিনি নতুন সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে থাকেন। আর এই সময়েই তাঁর মধ্যে ধূমপানের অভ্যাস গড়ে ওঠে, যা খুব দ্রুত আসক্তিতে পরিণত হয়। এই বিষয়ে সুমন বলেন, ‘আসক্তি তৈরি হয়ে যায়। আমি চাইলেই হয়তো সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিতে পারতাম, কিন্তু সেটি আসক্তি ছিল।’ তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সেই অভ্যাস থেকে মুক্তি পান এবং দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ধূমপানমুক্ত জীবন অতিবাহিত করছেন।

ধূমপানের পাশাপাশি মদ্যপানেও আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন সুমন। সামিটে নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা তিনি গোপন করেননি। তিনি বলেন, ‘আমি অনেক মদ্যপান করতাম। এটিও একধরনের আসক্তি। তবে আমি এটি ছাড়তে পেরেছি।’

মদ্যপানের সেই কঠিন সময়ে তাঁর মা উশা সুমন কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতেন, সেই স্মৃতিও ভাগ করে নেন অভিনেতা। সুমন জানান, অনেক সময় মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরলে তাঁর মা তাঁকে ঘরে ঢুকতে দিতেন না। মায়ের সেই কঠোর অবস্থান ও শাসন জীবনের ওই অন্ধকার পর্যায় থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

অতীতের এই তিক্ত অভিজ্ঞতাকে কেবল জীবনের ভুল অধ্যায় হিসেবে দেখতে চান না মিলিন্দ সুমন। তাঁর মতে, সেই সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় ছিল, কারণ এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া আমার প্রয়োজন ছিল। এটি ভালো ছিল, আমাকে নিজের সম্পর্কে শিখিয়েছে এবং আমার জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

আজকের মিলিন্দ সুমনকে ভারতের অন্যতম ফিটনেস আইকন হিসেবে গণ্য করা হয়। বয়স বাড়লেও শরীরচর্চা, দৌড়ানো এবং বিভিন্ন শারীরিক কর্মকাণ্ডে তাঁর আগ্রহ কমেনি। তবে তাঁর ফিটনেস দর্শন প্রচলিত ধারণার চেয়ে কিছুটা আলাদা। অভিনেতা জানান, প্রতিদিন শরীরচর্চার জন্য তিনি ১০ মিনিটের বেশি সময় ব্যয় করেন না। তিনি নিয়মিত জিমে যান না এবং ফিটনেস সাপ্লিমেন্টের ওপরও নির্ভর করেন না। তাঁর কাছে শরীরচর্চার সবচেয়ে বড় মন্ত্র হলো ধারাবাহিকতা। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও শরীরকে সক্রিয় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

সুমনের মতে, সবার জন্য কঠিন ব্যায়াম বা ব্যয়বহুল জিমের প্রয়োজন নেই। হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা পছন্দের কোনো খেলায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমেই শরীরকে সুস্থ রাখা সম্ভব। সাধারণ মানুষের সুস্থ থাকার জন্য খুব জটিল কোনো আয়োজনের দরকার নেই বলে তিনি বিশ্বাস করেন।