ডিজিটাল অবকাঠামোর দ্রুত প্রসার এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে গতিশীল করলেও, এই ভার্চ্যুয়াল জগতটি নারীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং ডিজিটালি রাইটের যৌথ প্রচেষ্টায় ‘অ্যাবিউজ বিয়ন্ড দ্য স্ক্রিন’ (পর্দা ছাপিয়ে সহিংসতা) শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনে এক উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে যে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৬৪ শতাংশ প্রযুক্তিসহায়ক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এই পরিসংখ্যানটি আমাদের বর্তমান সমাজ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার এক গভীর সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।

উক্ত গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ডিজিটাল সহিংসতার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছেন তরুণী, শিক্ষার্থী এবং উচ্চশিক্ষিত নারীরা। তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা নারীদের ৭৭ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীদের ৪৯ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে সাইবার আক্রমণের সম্মুখীন হচ্ছেন। এই অপরাধ ছড়িয়ে পড়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার।

সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা হলো, ভুক্তভোগী নারীদের জন্য প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ প্রায় শূন্যের কোঠায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর চরম দায়িত্বহীনতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে অভিযোগ জানানো হলেও ৫৬ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক এসব টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের দেশে কোনো স্থানীয় প্রতিনিধি নেই এবং তাদের কোনো আইনি জবাবদিহিতা নেই, যার ফলে তারা এ দেশের নারীদের নিরাপত্তাকে ক্রমাগত অবহেলা করে যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নারীদের বিচার পাওয়ার আশাকে আরও ম্লান করে দিচ্ছে। সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে মাত্র ৫ শতাংশ নারী পুলিশের দ্বারস্থ হতে পারছেন। তবে যারা আইনি সহায়তা চেয়েছেন, তাদের মধ্যে ৮২ শতাংশ নারী জানিয়েছেন যে, তাঁদের মামলায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। পাশাপাশি আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও অপরাধীদের পরোক্ষভাবে সুরক্ষা প্রদান করছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৭২ শতাংশ নারীর অভিমত—অনলাইনে নিপীড়নের শিকার হলে অপরাধীকে কাঠগড়ায় না তুলে উল্টো ভুক্তভোগী নারীকেই দোষারোপ করা হয়।

অনলাইনে নারীর প্রতি এই সহিংসতা বন্ধ করতে হলে এটিকে কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং একটি পদ্ধতিগত ও প্রযুক্তিগত সংকট হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে। শুধু নারীদের সচেতন হতে বলা কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। টেক জায়ান্ট প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশে স্থানীয় অফিস স্থাপন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিকার দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি থানায় সাইবার ক্রাইম তদন্তের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। নারীদের জন্য একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে ডিজিটাল বিপ্লবের সব অর্জনই ফিকে হয়ে যাবে।