সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন নারী নিজের মত জানাবেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন কিংবা জীবনের আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নেবেন—এ জন্য তাঁকে অশ্লীল মন্তব্য ও যৌন সহিংসতার হুমকি সহ্য করতে হবে কেন? এটি নারীর প্রতি বিদ্বেষ এবং সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলার এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক লক্ষণ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীর সমান অংশগ্রহণ ও সক্রিয়তা নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপের নীরব না থাকার যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পর্দার আড়ালে থেকে যা খুশি বলে পার পাওয়া যাবে—এই ভ্রান্ত ধারণাকে এখন প্রশ্নের মুখে আনা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, অনলাইন আচরণেরও একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। তবে এই ধরনের ব্যক্তিগত উদ্যোগের জনপ্রিয়তা একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিকারের ঘাটতিকেও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। ভুক্তভোগীর অভিযোগে দ্রুত সাড়া দেওয়ার পাশাপাশি যদি নিরাপত্তা ও যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করা হতো, তবে জবাবদিহির জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর এতটা নির্ভর করতে হতো না।
তবে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য। কোনো অ্যাকাউন্টে লেখা নাম, ছবি বা কর্মস্থলের তথ্যই সেই ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয়ের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ, ভুয়া পরিচয় কিংবা অন্যের ছবি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট চালানো সম্ভব। তাই পর্যাপ্ত যাচাই–বাছাই ছাড়া কারও পরিচয় জনসমক্ষে ছড়িয়ে দিলে নির্দোষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, যথাযথ প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভুল হলে তা দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা কিংবা পাল্টা হয়রানিতে উসকানি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলেরও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। কোনো অভিযোগ পেলে তা উপেক্ষা করা যেমন অনুচিত, তেমনি কেবল ভাইরাল পোস্ট দেখেই শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়াও সঠিক পদ্ধতি নয়। ন্যায্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হবে এবং আচরণের গুরুত্ব অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু গুরুতর হুমকিকে শুধু ‘শব্দচয়নের ভুল’ বলে এড়িয়ে যাওয়া চলে না। অনুতাপ বা অনুশোচনার বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল আচরণের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর উদ্যোগের মাধ্যমেই বোঝা যাবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলায় হয়রানিমূলক বক্তব্য শনাক্ত করার ক্ষমতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। বিশেষ করে যৌন সহিংসতার হুমকি, সংঘবদ্ধ আক্রমণ ও বিকৃত ছবি ছড়িয়ে পড়ার মতো গুরুতর অভিযোগে দ্রুত সাড়া দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমগুলোকেও নিজেদের ওয়েবসাইটের মন্তব্যের ঘর নিয়মিত তদারক করতে হবে। পাঠকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর অজুহাতে নারীবিদ্বেষী মন্তব্য রেখে দেওয়া দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অভিযোগ করার প্রক্রিয়াটি সহজ, সংবেদনশীল এবং গোপনীয় হওয়া দরকার। অভিযোগকারীকে দোষারোপ করা, অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা অনলাইন ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া কোনো প্রকৃত প্রতিকার নয়। বরং প্রমাণ সংরক্ষণ, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সমালোচনা এবং হয়রানির মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট রাখতে হবে, যাতে নারীর সুরক্ষার কথা বলে বৈধ মতপ্রকাশ দমনের সুযোগ তৈরি না হয়।
দীর্ঘ মেয়াদে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিসরে সম্মতি, মর্যাদা এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণের শিক্ষা প্রদান করা জরুরি। নারীকে শুধু গোপনীয়তা রক্ষার কৌশল শেখালে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; বরং যাঁরা হয়রানি করেন এবং এই কাজে উৎসাহ দেন, তাঁদের আচরণগত পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বন্ধু বা সহকর্মীর অশ্লীল মন্তব্যে হাসির প্রতিক্রিয়া দেওয়াও এই নেতিবাচক সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
নারী অনলাইনে থাকবেন কি না, তা হয়রানিকারীরা নির্ধারণ করতে পারেন না। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ তাঁকে আড়ালে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা। রাষ্ট্র, সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। নারীর কণ্ঠ রুদ্ধ করার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রয়োজন ধারাবাহিক সামাজিক প্রতিরোধ এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি।