একসময় শুধু বসতবাড়ির আঙিনায় লাগানো গাছেই কেবল দেশি ফল বরই পাওয়া যেত। এখন সে বরই বা কুলের চাষ হয় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। দিন দিন চাহিদাও বেড়েছে দেশি ফলটির। বাসাবাড়ির পাশাপাশি অফিসেও ‘কুল-বরই’ খাওয়ার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দেশি জাতের টক–মিষ্টি বরই থেকে শুরু করে আপেল কুল, বাউকুল, থাইকুল, বনসুন্দরীসহ উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের মিষ্টি বরইয়ের বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে। কুলের মৌসুম শুরু হয় জানুয়ারিতে, যা শেষ হয় এপ্রিলে। বছরের এই সময় অন্য দেশি ফল তুলনামূলক কম থাকায় ভালো বাজার পায় কুল।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপযোগী মাটি ও আবহাওয়ার কারণে দেশে সবচেয়ে বেশি কুল উৎপাদন হয় রাজশাহী ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিসিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে কুল উৎপাদন হয় ১ লাখ ১ হাজার ৫২৩ টন। এর ভিত্তিতে বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও কৃষিবিদ মো. মেহেদী মাসুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রতি কেজির দাম ১০০ টাকা করে ধরলেও দেশে উৎপাদিত কুলের বাজারমূল্য এক হাজার কোটি টাকার বেশি হবে।
আগের ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৮১৮ টন কুল উৎপাদন হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২২–২৩ ও ২০২১–২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল যথাক্রমে ৯৭ হাজার ও ৯৫ হাজার টন। কৃষিবিদ ও ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলেন, প্রকৃত উৎপাদন সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে।
মৌসুমের শুরুতে এখন ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি কুল (বড়) ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। ছোট আকারের দেশি বরই বিক্রি হয় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা নাহিদ হোসেন বলেন, কিছুদিনের মধ্যে সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে।
মাগুরার নাসির অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাসির হোসেন মুক্তকণ্ঠকে জানান, তিনি এবার পাঁচ বিঘা জমিতে কুল চাষ করছেন। প্রতি একরে খরচ পড়েছে প্রায় ২ লাখ টাকা। প্রতি মণ কুল এখন আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাতে একরপ্রতি ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার কুল বিক্রি হতে পারে। এ থেকে তিনি একরে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন।
২০২৩–২৪ অর্থবছরের উৎপাদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী জেলায় সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৭৫৯ টন কুল উৎপাদন হয়েছে। ৭ হাজার ২২৯ টন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ। এ ছাড়া ৪ হাজার ১২৮ টন উৎপাদন নিয়ে কুমিল্লা আছে তৃতীয় স্থানে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া ৩ হাজার ৬৩৬ টন ও চট্টগ্রাম ৩ হাজার ৫৯৪ টন নিয়ে যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, উপযোগী মাটি ও সহজ বাজারজাতের ব্যবস্থার কারণে রাজশাহী ও ময়মনসিংহে কুল চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার উপপরিচালক মো. এনামুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এখানকার মাটি কুল চাষের উপযোগী। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় বাজারজাতকরণ সহজ হয়। ফলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পান। তাই ফুলবাড়িয়া ও ভালুকায় ব্যাপকভাবে কুলের চাষ হচ্ছে।
কৃষিবিদদের মতে, দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় বনসুন্দরী, আপেল কুল ও স্থানীয় জাত ঢাকা–১৯ ও বাউকুল। ১ ফুট উচ্চতার একটি গাছে এক বছরের মধ্যেই ২০ কেজি পর্যন্ত কুল পাওয়া যায়। প্রতি একর জমিতে গড়ে ৩০০টি গাছ লাগানো যায়। পরের বছর গাছের গোড়া থেকে এক হাত পর্যন্ত রেখে বাকিটা ছেঁটে দিতে হয়। সেখান থেকে নতুন ডালপালা গজায়। তবে ডালপালা সঠিকভাবে ছাঁটাই না হলে ফলন কমে যায়।
দেশে বাণিজ্যিক কুল চাষের সূচনা সম্পর্কে কৃষিবিদ মো. মেহেদী মাসুদ জানান, ২০১৪ সালের দিকে ভারতের মহারাষ্ট্র ও কাশ্মীর থেকে আনা জাত দিয়ে দেশে কুলের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। পরে স্থানীয় হর্টিকালচার সেন্টার থেকে এসব চারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, কুল মূলত বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমার অঞ্চলের ফল। আশির দশকে ভারত থেকে উন্নত জাত আমদানির পর চাষ বাড়তে থাকে। কুল খরাসহিষ্ণু, রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়। অর্থাৎ এটি সহজে উৎপাদন করা যায়। শীতের শেষ দিকে অন্য দেশি ফল না থাকায় কুল ভালো কদর পায়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান বলেন, বারি থেকে পাঁচটি কুলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে নারিকেলি জাতটি কুমিল্লা এলাকায় বেশি চাষ হচ্ছে। আপেল কুল এনেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) থেকে বাউকুল জাত উদ্ভাবনের পর কুল চাষে বিপ্লব ঘটে।
মো. মসিউর রহমান বলেন, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্য দেশি ফল তেমন থাকে না। জানুয়ারির পর দেশি কমলাও পাওয়া যায় না। বিদেশি আপেল ও কমলার দাম বেশি। এ ছাড়া ফল খাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে এবং কুলের স্বাদও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। এসব কারণে কুল জনপ্রিয় ফল হয়ে উঠেছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যমতে, কুল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এটি রক্ত শোধন ও হজমে সহায়ক। পেটের গ্যাস ও অরুচি দূর করতে কুলের ফুল থেকে তৈরি ওষুধও ব্যবহৃত হয়।






