ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ এই অনিয়মকারীদের সঙ্গে আঁতাত করেছেন।

আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। মূলত আগামীকাল ঢাকা থেকে খুলনা–কুষ্টিয়া অভিমুখে লংমার্চের প্রস্তুতি ও সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে জানাতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।

সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার বলেন, “সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সচিব ও প্রধান যদি অনিয়মকে অস্বীকার করেন, তাহলে বুঝতে হবে যাঁরা অনিয়ম করেছেন, তাঁদের সঙ্গে সিইসি ও ইসি সচিবের আঁতাত রয়েছে। তাঁরা সাংবিধানিক পদে বসে এই পদের প্রতি সুবিচার করেননি।”

উল্লেখ্য, গতকাল ঠাকুরগাঁও–১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছিলেন, উপনির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে এবং এই নির্বাচন নিয়ে ইসি সন্তুষ্ট। এর আগে এ এম এম নাসির উদ্দীন নির্বাচন ভবনে উপনির্বাচনের কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল পর্যবেক্ষণ করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “উপনির্বাচন শান্তিপূর্ণ হচ্ছে। ১১–দলীয় জোটের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সমাধান করা হয়েছে।”

তবে এই দাবিগুলোর তীব্র বিরোধিতা করে গোলাম পরওয়ার জানান, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তারা পরিচয়পত্র বা ব্যাজ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, “১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাড়াতাড়ি কলম দিয়ে কাগজে পরিচয় লিখে পকেটে টানায়। তারা কোনো নিয়োগপত্রও দেখাতে পারেননি। ফলে তাঁরা নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ করা কর্মকর্তা কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ ছিল না।”

জামায়াত সেক্রেটারি আরও অভিযোগ করেন যে, নির্বাচনে আগে থেকেই ব্যালট পেপারে সিল মারা, জাল ভোট প্রদান এবং কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। তাঁর দাবি, কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা না করেই পুলিশের গাড়িতে করে চলে যাচ্ছিলেন, তখন দাঁড়িপাল্লার ভোটারেরা সেই গাড়ি থামিয়েছিলেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, এতসব ঘটনার পরেও ইসি সচিব যখন অনিয়মের কথা অস্বীকার করেন, তখন তা যেন অনিয়মকেই বৈধতা দেওয়ার শামিল। তবে উপনির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, তৃণমূল থেকে আরও অনেক তথ্য আসছে, যা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে তাঁরা পরবর্তী সময়ে বক্তব্য জানাবেন।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি ও সংঘাতের আশঙ্কা
সংবাদ সম্মেলনে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারকে গণভোটের রায় মানতে হবে, অন্যথায় রাজনৈতিক সংকট নিরসনের কোনো বিকল্প থাকবে না। সরকার যদি একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাব নিয়ে চলতে থাকে, তবে রাজনীতি সংঘাতের দিকে যাবে এবং সরকারই দেশকে সেদিকে ঠেলে দিচ্ছে। জামায়াত এই সংকটের সমাধান সংসদের মাধ্যমেই চায়।

গোলাম পরওয়ার উল্লেখ করেন, আগামী ৯ নভেম্বর সংসদের অধিবেশন রয়েছে। সরকার জনগণের আস্থার প্রতি সম্মান দেখাতে চাইলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে হবে, যার জন্য কোনো বিশেষ কমিটির প্রয়োজন নেই। তিনি দাবি করেন, জনগণ গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে।

লংমার্চে দেড় হাজার গাড়ির লক্ষ্যমাত্রা
আগামীকাল শনিবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের খুলনামুখী লংমার্চের প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি জানান, রাজধানীর বায়তুল মোকাররম থেকে গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক ধরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু পার হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়ার দিকে যাবে। প্রায় ৪২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রাপথে ১৯টি জেলা অতিক্রম করা হবে এবং পথে একাধিক পথসভা অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি জানান, শুরুতে বহরে ৬৫০ থেকে ৭০০টি গাড়ি থাকবে। বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ি যুক্ত হয়ে খুলনায় পৌঁছানোর সময় বহরে প্রায় এক হাজার গাড়ি হবে। পরবর্তীতে যশোর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া থেকে আরও গাড়ি যুক্ত হবে। তাঁদের আশা, কুষ্টিয়া জেলা স্টেডিয়াম পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হবে।

লংমার্চ শান্তিপূর্ণ রাখার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, পথে কোথাও উসকানিমূলক বক্তব্য বা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন স্লোগান দেওয়া যাবে না। কোনো ধরনের উসকানি বা বাধার মুখে পড়লেও গাড়ি থেকে না নেমে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখতে হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানান।

এছাড়া বিমানবাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তার নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে তাঁর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মোবারক হোসাইন, মতিউর রহমান আকন্দ, সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।