সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি দাবি করেন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিএনপির সংসদ সদস্যরা কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছেন, অথচ বিরোধী দলগুলো এই বিষয়ে কথা তুললে অন্য কোনো খাত থেকে সামান্য কিছু অর্থ দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিকে একটি উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “বাচ্চারা কান্নাকাটি করলে তাদের চকলেট দেওয়া হয়। বিরোধী দলকে চকলেট দিয়ে খুশি করে, আর তারা বিরিয়ানি খায়।”
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, রাষ্ট্র, সরকার এবং সরকারি দল—এই তিনটি ভিন্ন সত্তাকে বর্তমান প্রশাসন গুলিয়ে ফেলছে। তিনি উল্লেখ করেন, যখন বিরোধী দল সরকারের অপকর্মের প্রতিবাদ করে, তখন সেটিকে রাষ্ট্রের বিরোধিতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, সরকার একদলীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে পরোক্ষভাবে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, নিজেদের দলীয়করণ, ব্যর্থতা এবং দুর্নীতির বিষয়গুলো আড়াল করতে সরকার ভয় দেখিয়ে সব দায়ভার বিরোধী দলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিরোধী দল কখনোই ফ্যাসিস্টদের আসার সুযোগ করে দিচ্ছে না; বরং বিরোধী দলের আন্দোলনকে উপেক্ষা করার মাধ্যমে সরকার নিজেই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করছে। তাঁর দাবি, “এই পথ দিয়ে তারাই ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢোকার পথ করে দিচ্ছে।”
গত কয়েক মাসে তিন জন মন্ত্রী এবং একজন সংসদ সদস্যের বিদায় নেওয়ার ঘটনায় সরকারের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বিরোধী দল জুলাইকে ধারণ করে না’—এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার একে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “মানুষ তার দুর্বলতা ঢাকতে বিভিন্ন কথা বলে, তবে তারও একটা মাত্রা থাকে।” তিনি আরও জানান, জামায়াতসহ ১১টি দল জুলাইকে ধারণ করেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে না বলেই তারা গণভোটের বিষয়টিকে অস্বীকার করছে।
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি সেখানে যাননি—প্রধানমন্ত্রীর এই অভিযোগের বিষয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য কার্ড পাঠানো হলেও সেই কার্ডে বা অতিথি তালিকায় তাঁর নামের কোনো উল্লেখ ছিল না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “তিনি কি সেখানে গিয়ে সাধারণ শ্রোতাদের চেয়ারে বসবেন?”
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দল সহায়তা করছে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের যে দাবি, তার জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য বিরোধী দলের সাহায্যের প্রয়োজন কেন? তাঁর মতে, জনগণ গণভোটের মাধ্যমেই সংবিধানে জুলাই সনদ অনুমোদন করেছে। তিনি জানান, সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে গণভোটের রায় কার্যকর করতে বিরোধী দল সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে একদলীয় কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধন করতে চাইলে সেই অপকর্মে বিরোধী দল কোনো সাহায্য করবে না।
গত রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ফ্যাসিস্টদের পথ সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কাছে জানতে চেয়েছেন। এই প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদকে চিনেছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ফ্যাসিস্ট কী, তা মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে বিএনপির মহাসচিব রিজভী ভুলে গেছেন। তাঁর পরামর্শ, ফ্যাসিস্টদের চিনতে হলে রিজভীকে তাঁর দলীয় কর্মীদের কাছে ফিরে যেতে হবে, কারণ তারা ফ্যাসিস্টদের কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে পারবে।
চাঁদাবাজি, ধ্বংসযজ্ঞ, খুন এবং লুণ্ঠনই হলো ফ্যাসিবাদের পথ বলে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের লোকজন সরকারের সব পদে নিজ দলের লোক বসিয়ে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায় উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি এখন সেই একই পথে যাত্রা করছে।
১৯৯৪-৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের সঙ্গে একই পথে হেঁটেছে—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের এই দাবির প্রেক্ষিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনোই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেনি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বিএনপি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মানতে অস্বীকার করেছিল, তখন শুধু আওয়ামী লীগ নয়, জাতীয় পার্টি ও বাম দলসহ বিরোধী দলগুলোর একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই সম্মিলিত কর্মসূচিতে জামায়াতও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি দাবি করেন, বিএনপির গণবিরোধী অবস্থানের কারণেই সেবার তারা ক্ষমতায় আসতে পারেনি। তবে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিল—এই কথাটি সত্য নয়; বরং বিএনপির অবস্থানের কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামীর কুষ্টিয়ার সংসদ সদস্য আমির হামজার মাহফিলে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়, যা ঠেকাতে না পেরে সরকার প্রশাসনিক ক্ষমতা খাটিয়ে তা বন্ধ করে দিচ্ছে। তিনি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, “তাহলে বিএনপি কোরআনের তাফসির আর ওয়াজ মাহফিল শুরু করুক। দেখা যাবে, কার মাহফিলে কত লোক হয়।” তিনি সরকারকে এই পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান।
এছাড়া ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার সব গভর্নিং বডি এবং ম্যানেজিং কমিটি এক প্রজ্ঞাপনে ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে কথা বলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এসব মাদ্রাসায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাদ দিয়ে সরকার নিজস্ব চিন্তার লোকদের মাধ্যমে হাজার হাজার মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূত থাকা সত্ত্বেও এই ঘটনায় কূটনৈতিক ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে। তিনি বলেন, যখন ওই ব্যক্তিরা বিচারের আগে আসামি হয়েছিলেন, তখনই বিষয়টি সরকারের নজরে আসার কথা ছিল। ওই দেশের দূতাবাসের দায়িত্ব ছিল আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া, কিন্তু তারা বিষয়টি জানত না এবং সরকারকে জানায়নি। যখন বিচার কার্যকর হয়ে গেল, তখন সরকারের ঘুম ভেঙেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আবদুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোাসাইন ও মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান প্রমুখ।