সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ বহাল রাখার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনজুর কাদের ভূঁইয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। সমিতির সংরক্ষিত নথিপত্র অনুযায়ী, তিনি ২০০২ সাল থেকে এই সমিতির সদস্য হিসেবে নিবন্ধিত। তবে পুলিশের চাকরিতে প্রবেশের পর তিনি সদস্যপদ স্থগিত করার জন্য আবেদন করেছিলেন বলে দাবি করেছেন ওই ওসি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার সঙ্গে উক্ত ওসির একটি বাগ্‌বিতণ্ডার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই বিষয়টি জনসমক্ষে আসে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সরাইলে দায়িত্ব পালনের আগে মনজুর কাদের ভূঁইয়া চট্টগ্রাম জেলা ও কক্সবাজারে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর আদি বাড়ি ফেনী জেলায়।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সরাইল থানার ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ২০০২ সালে সমিতির সদস্য হলেও ২০০৪ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর সদস্যপদ স্থগিতের জন্য আবেদন করেছি।’

তিনি আরও জানান, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির পাঠানো নোটিশটি তিনি পেয়েছেন। সদস্যপদ স্থগিত করার জন্য আগে যে আবেদনটি করেছিলেন, তার একটি অনুলিপি তিনি ইতিমধ্যে সমিতিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈনুদ্দীন আজ শুক্রবার দুপুরে মুক্তকণ্ঠকে জানান, সংসদ সদস্যের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওসির আইনজীবী সমিতির সদস্য থাকার বিষয়টি সামনে আসে। তিনি ২০০২ সাল থেকে সদস্য হিসেবে আছেন। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় কেন তিনি আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ ছাড়েননি, সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে ২৬ অক্টোবর কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

সদস্যপদ স্থগিতের আবেদনের বিষয়ে মো. মঈনুদ্দীন বলেন, স্থগিতের আবেদন করলে সদস্যপদ থাকার কথা নয়। সদস্যপদ আছে বলেই নোটিশ করা হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারি চাকরিতে থেকে আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ সক্রিয় রাখা সমিতির বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্য পেশায় যুক্ত থেকেও যাঁরা সদস্যপদ বহাল রেখেছেন, তাঁদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সমিতি সূত্রে জানা গেছে, আইন পেশায় নিয়মিত যুক্ত না থেকেও যাঁরা সদস্যপদ ধরে রেখেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করতে সম্প্রতি উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। এই লক্ষ্যে গত ২৫ জুন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাকরিরত সদস্যদের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় সদস্যপদ স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সমিতির গঠনতন্ত্রের পরিচ্ছেদ ৩-এর ৭(১) বিধি অনুযায়ী, আইন বিষয়ে শিক্ষকতা ও কোনো প্রতিষ্ঠানে আইন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দিয়ে সদস্যপদ বহাল রাখতে পারবেন। অন্যথা বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া নিষ্ক্রিয় সদস্যদের শনাক্ত করতে অভিযোগ বাক্সে নাম-ঠিকানাসহ তথ্য জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, গত ২২ অক্টোবর সন্ধ্যায় সরাইল থানার ওসির কক্ষে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ও ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার মধ্যে তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। সেই সময় সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর নেতা-কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের কথোপকথনের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়া তিনটি ভিডিওর একটির দৈর্ঘ্য ৭ মিনিট ৮ সেকেন্ড, অন্যটি ৫৭ সেকেন্ড এবং তৃতীয়টি ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ড।

ভিডিওতে দেখা যায়, ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া তাঁর কক্ষে বসে আছেন এবং পাশে বসে আছেন রুমিন ফারহানা। ওসির টেবিলের চারপাশে সংসদ সদস্যের নেতা-কর্মীরা দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। সংসদ সদস্য, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন বিষয়ে ওসিকে প্রশ্ন করছেন। বারবার ফোন করা সত্ত্বেও সংসদ সদস্যের ফোন না ধরা এবং তাঁকে যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান না করা—এই বিষয়গুলো নিয়ে তাঁদের সঙ্গে ওসির বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, ওসি ইটভাটা, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন থেকে টাকা নেন। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলতে থাকে। একপর্যায়ে ওসি পুলিশ সুপারকে ফোন করে পরিস্থিতি জানান এবং কক্ষে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের ভিডিও কলে দেখান। তিনি সেখানে মব সৃষ্টির আশঙ্কার কথা বলেন। তবে ওই সময় সংসদ সদস্য পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও ওসি তাতে সাড়া দেননি।

পরবর্তীতে কথোপকথনের এক পর্যায়ে রুমিন ফারহানা ওসিকে বলেন, ‘আপনি (ওসি) যখন বলতেছেন, ওনার নিরাপত্তা ওনার লোকজন দিবেন। তার মানে, আমি দিব না।’ উত্তরে ওসি বলেন, ‘এটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাস্তাঘাটে হাঁটি বেড়ায়..।’ তখন রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। জি স্যার, আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি।’