ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) রুমিন ফারহানা এবং সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার মধ্যে এক উত্তপ্ত বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় থানার ওসির কক্ষে এই ঘটনাটি সংঘটিত হয়। সেই মুহূর্তে সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।

রুমিন ফারহানার কর্মী ও সমর্থক মহলে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে সংসদ সদস্যের সঙ্গে সরাইল থানার ওসির সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং দূরত্ব তৈরি হয়। অভিযোগ করা হয়েছে যে, সংসদ সদস্য নিজে অথবা তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জাকির হোসেন ফোন করলেও ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া তাতে সাড়া দেননি এবং ফোনও ধরেননি। এমনকি সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা চাওয়া হলেও তা তিনি পাননি। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সরাইল থানায় যান রুমিন ফারহানা।

থানার ওসির কক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে যে উত্তপ্ত কথোপকথন চলে, তার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়া তিনটি ভিডিওর মধ্যে একটির দৈর্ঘ্য ৭ মিনিট ৮ সেকেন্ড, দ্বিতীয়টির ৫৭ সেকেন্ড এবং তৃতীয়টির ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ড।

ভিডিও ফুটেজগুলোতে দেখা যায়, ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া তাঁর কক্ষে বসে আছেন এবং তাঁর পাশেই বসে ছিলেন রুমিন ফারহানা। ওসির টেবিলের চারপাশ ঘিরে ছিলেন সংসদ সদস্যের নেতা-কর্মীরা। ভিডিওতে দেখা যায়, সংসদ সদস্য, তাঁর পিএস এবং নেতা-কর্মীরা সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন বিষয়ে ওসিকে প্রশ্ন করছেন। বারবার ফোন করা সত্ত্বেও কেন ফোন ধরা হয়নি এবং কেন তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি—এই বিষয়গুলো নিয়ে ওই সংসদ সদস্য ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে ওসির তীব্র বিতণ্ডা হয়।

তর্কের এক পর্যায়ে রুমিন ফারহানা অভিযোগ করে বলেন, ওসি ইটভাটা, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন থেকে টাকা নেন। দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলতে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ওসি পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেন। তিনি সেখানে 'মব' সৃষ্টির কথা বলেন এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে কক্ষে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের এসপিকে দেখান। এই সময়ে সংসদ সদস্য এসপির সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও ওসি তাতে কোনো সাড়া দেননি।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে রুমিন ফারহানা ওসিকে বলেন, ‘আপনি (ওসি) যখন বলতেছেন, ওনার নিরাপত্তা ওনার লোকজন দিবেন। তার মানে আমি দিব না।’ এর উত্তরে ওসি বলেন, ‘এটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাস্তাঘাটে হাঁটি বেড়ায়..।’ তখন রুমিন ফারহানা পাল্টা বলেন, ‘আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। জি স্যার, আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি।’

রুমিন ফারহানা আরও অভিযোগ করেন যে, দুর্গাপূজার সময় আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে পুলিশ তাঁকে নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে তেমন কোনো নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘দুর্গাপূজার সময় আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে আমাকে পুলিশ নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে কোনো নিরাপত্তা দেয়নি। আমার পিএস ১২ বার ফোন দিলেও তিনি (ওসি) ধরেননি। উনি বলেছেন, আমার নিরাপত্তা আমাকে ব্যবস্থা করতে হবে। আমি আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। এখন থেকে ১০ হাজার লোকজন নিয়েই চলব।’

এই পুরো ঘটনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রুমিন ফারহানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নানান অভিযোগ ওনার (ওসি) বিরুদ্ধে। এসব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলাম। আমি একটা তালিকাও নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি কোনো মন্তব্যও করেন নাই। দুই পাতার তালিকা ছিল যে এই তারিখে এই অপরাধ, ওই তারিখে ওই অপরাধ। উনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।’

মব তৈরির অভিযোগের বিষয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘মব সাধারণত যায় থানায় আসামি ছিনাইয়া আনতে। আমি কি কোনো আসামি ছিনাইয়া আনছি, এক। আমি কি ওনার কাছে টাকা দাবি করেছি, দুই। আমি কি বলেছি আমাকে কিছু দিতে হবে, তিন। আমি তিনটার একটাও বলিনি। তাহলে মব হলো কোথা থেকে।’

নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে রুমিন ফারহানা পুনরায় উল্লেখ করেন, ‘দুর্গাপূজার সময় আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে আমাকে পুলিশ নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে কোনো নিরাপত্তা দেয়নি। আমার পিএস ১২ বার ফোন দিলেও তিনি (ওসি) ধরেননি। উনি বলেছেন, আমার নিরাপত্তা আমাকে ব্যবস্থা করতে হবে। আমি আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। এখন থেকে ১০ হাজার লোকজন নিয়েই চলব।’

অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সংসদ সদস্য মহোদয় এসেছিলেন। তিনি শত শত লোক নিয়ে থানার মধ্যে হইচই করে একটি অস্থিরতা তৈরি করে আমার কক্ষে। একটা বিব্রতকর অবস্থা।’ নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়ে ওসি দাবি করেন, ‘আমরা পূজাকেন্দ্রিক সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা করেছি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য উনি গানম্যান চাইবেন। সেটা আলাদা বিষয়। একটা দল ওই সময় তাঁর সঙ্গে রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল।’

ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মব তৈরির অভিযোগ তুলে ওসি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের লোকজনকে গ্রেপ্তার না করার জন্য আমাকে সব সময় চাপ প্রয়োগ করেন তিনি (রুমিন ফারহানা)। আমি নোটডাউন করে রেখেছি। উনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে এখানে এসেছেন। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সব মিথ্যা।’