শীতের আগমনে অনেকেরই দাঁত শিরশির করার সমস্যা দেখা দেয়। অনেকেই একে শীতকালীন সাধারণ সমস্যা হিসেবে ধরে নিয়ে এড়িয়ে যান। তবে চিকিৎসকদের মতে, দাঁতের এই সংবেদনশীলতা সবসময় সাধারণ বিষয় হয় না; এটি অনেক সময় এনামেল ক্ষয়, মাড়ির জটিলতা কিংবা দাঁতের অন্য কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে। তাই বারবার এমন অনুভূতি হলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

শীতের শুরুতেই ঠান্ডা পানি পান করলে, আইসক্রিম খেলে কিংবা শীতের সকালে ঠান্ডা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সময় অনেকের দাঁতে হঠাৎ শিরশিরানি অনুভূত হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে গরম চা খেলেও দাঁতে অস্বস্তি তৈরি হয়।

দাঁতের গঠন বুঝতে হলে জানা প্রয়োজন যে, দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণটিকে বলা হয় এনামেল। এর ঠিক নিচেই থাকে ডেন্টিন, যার ভেতরে অসংখ্য সূক্ষ্ম নালি বিদ্যমান। সাধারণত দাঁতের গোড়ার অংশটি মাড়ি দিয়ে আবৃত থাকে। কিন্তু কোনো কারণে যদি এনামেল ক্ষয়ে যায় অথবা মাড়ি সরে গিয়ে ডেন্টিন উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, তবে ঠান্ডা, গরম, মিষ্টি কিংবা টক খাবারের উদ্দীপনা সরাসরি দাঁতের ভেতরের স্নায়ুতে প্রভাব ফেলে। এর ফলে খুব অল্প সময়ের জন্য তীক্ষ্ণ ব্যথা বা শিরশিরানি অনুভূত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ডেন্টিন হাইপারসেনসিটিভিটি।

এই সমস্যার পেছনে বেশ কিছু সাধারণ কারণ থাকে। যেমন—শক্ত ব্রাশ দিয়ে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে দাঁত মাজা, ঘন ঘন অ্যাসিডিক খাবার ও পানীয় গ্রহণ, মাড়ি সরে যাওয়া এবং দাঁতের উপরিভাগ ক্ষয়ে যাওয়া। তবে দাঁতে ক্যারিজ বা ক্ষয়, সূক্ষ্ম ফাটল কিংবা পুরোনো ফিলিংয়ের ত্রুটির কারণেও একই ধরনের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

শীতের ঠান্ডা বাতাস এবং ঠান্ডা পানীয় আগে থেকেই সংবেদনশীল দাঁতের অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, শীত এলেই সবার দাঁতের সংবেদনশীলতা বেড়ে যায় এমনটি নয়। যাদের দাঁতের সুরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা ডেন্টিন উন্মুক্ত হয়ে আছে, তারা তাপমাত্রার পরিবর্তনে বেশি ব্যথা অনুভব করেন। তাই কেবল শীতকালকে দায়ী না করে নিজের দাঁতের বর্তমান অবস্থা এবং প্রতিদিনের অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

শিরশিরানি অনুভূত হলেই যে দাঁতের স্নায়ুতে প্রদাহ হয়েছে, তা নয়। সাধারণ সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রে ঠান্ডা বা গরমের উদ্দীপনা সরিয়ে নিলে ব্যথা দ্রুত কমে যায়। কিন্তু যদি ব্যথা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়, কোনো উদ্দীপনা ছাড়াই শুরু হয়, রাতে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় কিংবা খাবার চিবানোর সময় বেড়ে যায়, তবে দাঁতের ভেতরের পাল্পে প্রদাহ, গভীর ক্যারিজ বা দাঁতে ফাটল থাকার প্রবল আশঙ্কা থাকে।

এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে কেবল সংবেদনশীল দাঁতের টুথপেস্ট ব্যবহার করে অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। ব্যথার ধরন ও দাঁতের সামগ্রিক অবস্থা পরীক্ষা করে, প্রয়োজনে এক্স-রের সাহায্যে একজন দন্তচিকিৎসক সমস্যার সঠিক কারণ নির্ণয় করতে পারেন।

আমাদের প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস অজান্তেই দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। শক্ত ব্রাশ দিয়ে জোরে ঘষলে দাঁতের উপরিভাগ ক্ষয়ে যেতে পারে এবং মাড়ি সরে গিয়ে দাঁতের গোড়ার সংবেদনশীল অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া লেবু, কোমল পানীয় ও অন্যান্য অ্যাসিডিক খাবার বা পানীয় ঘন ঘন গ্রহণ করলে এনামেল ক্ষয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

আবার অনেকের ঘুমের মধ্যে দাঁত চেপে রাখা বা ঘষার অভ্যাস থাকে, যার ফলে দাঁতের উপরিভাগ ক্ষয়ে যেতে পারে কিংবা সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে পারে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোয়ালে ব্যথা, দাঁতের কিনারা ক্ষয়ে যাওয়া বা দাঁতে অস্বস্তি অনুভব করলে দ্রুত দন্তচিকিৎসককে জানানো উচিত।

দাঁত সুস্থ রাখতে প্রথমেই পরিষ্কার করার সঠিক অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নরম ব্রাশ ব্যবহার করে দিনে দুবার, প্রতিবার প্রায় দুই মিনিট ধরে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজুন। দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার রাখতে ডেন্টাল ফ্লস বা উপযুক্ত ইন্টারডেন্টাল ক্লিনার ব্যবহার করা যেতে পারে।

সংবেদনশীল দাঁতের জন্য বিশেষায়িত টুথপেস্টে পটাশিয়াম নাইট্রেট বা স্ট্যানাস ফ্লোরাইডের মতো উপাদান থাকে। নিয়মিত ব্যবহারে এগুলো শিরশিরানি কমাতে সাহায্য করে, তবে পূর্ণ উপকার পেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

অ্যাসিডিক খাবার বা পানীয় গ্রহণের পর অবশ্যই পানি দিয়ে কুলি করে নিতে হবে এবং দাঁত ব্রাশ করার আগে অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করা উচিত। দাঁত পরিষ্কার করার জন্য লেবু, লবণ বা কয়লা ঘষে পরিষ্কার করার চেষ্টা করবেন না, কারণ এতে এনামেলের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। এছাড়া ব্যথার ভয়ে দাঁত পরিষ্কার করা বন্ধ করা বা কেবল এক পাশ দিয়ে খাবার চিবানোও সঠিক পদ্ধতি নয়।

যদি শিরশিরানি বারবার হয়, একটি নির্দিষ্ট দাঁতে বেশি অনুভূত হয় কিংবা ব্যথা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়, তবে দেরি না করে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কামড় দিলে ব্যথা, দাঁতে দৃশ্যমান ফাটল, মাড়ি ফুলে যাওয়া বা রাতে ব্যথা বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়। যদি মুখ বা গাল ফুলে যাওয়ার সঙ্গে জ্বর থাকে, তবে দ্রুত চিকিৎসা নিন। আর শ্বাস নিতে বা গিলতে অসুবিধা হলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা প্রয়োজন।

চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে সমস্যার কারণের ওপর নির্ভর করে। কোনো ক্ষেত্রে কেবল ফ্লোরাইড প্রয়োগ বা সংবেদনশীলতা কমানোর চিকিৎসাই যথেষ্ট হয়। আবার ক্যারিজ বা ফাটল থাকলে ফিলিং কিংবা অন্য বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। দাঁতের পাল্পে প্রদাহ হলে তার জন্য আলাদা চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

মনে রাখবেন, দাঁত শিরশির করা মানেই দাঁত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এমন নয়। তবে সমস্যাটি বারবার দেখা দিলে কারণ শনাক্ত করাই দাঁত সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শীত উপভোগ করতে গিয়ে দাঁতের অস্বস্তিকে অবহেলা করবেন না।