ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিট। পশ্চিম দিক থেকে হেঁটে আসছিল ছয়জন মুখোশধারী। পুষ্পপাড়া বাজারে অবস্থানরত দুজনকে লক্ষ্য করে মুহূর্তেই শুরু হয় এলোপাতাড়ি গুলি। গুলিতে সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তারা। মৃত্যু নিশ্চিত করে আবার পশ্চিম দিকে চলে যায় হামলাকারীরা। যাওয়ার সময় আতঙ্কের সৃষ্টি করতে শূন্যেও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে তারা।
পুরো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে সময় লাগে মাত্র এক মিনিট। যেন কোনো সিনেমা বা থ্রিলারের দৃশ্য—হত্যাকণ্ড ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে হেঁটে চম্পট দেয় খুনিরা। পাবনার আতাইকুলার পুষ্পপাড়া বাজারে বিএনপি নেতা ও হাটের ইজারাদারকে গুলি করে হত্যার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে এমন নৃশংস দৃশ্য দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে পাবনা সদর উপজেলার আতাইকুলা থানাধীন ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পুষ্পপাড়া বাজার এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে।
নিহত দুজন হলেন—রিপন হোসেন (৪০) ও আব্দুস সালাম (৫০)। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা। রিপন আতাইকুলা থানা বিএনপির সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও আতাইকুলা ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি ছিলেন। তিনি ধর্মগ্রাম এলাকার মৃত ওমেদ আলীর ছেলে।
অন্যদিকে আব্দুস সালাম একই এলাকার মৃত আরজ আলী ব্যাপারীর ছেলে এবং পুষ্পপাড়া হাটের ইজারাদার ছিলেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আব্দুস সালাম আগে শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও গত ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াতের বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে অংশ নিচ্ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আব্দুস সালাম নিজ কার্যালয়ে বসে ছিলেন। এ সময় ৭-৮ জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত কার্যালয়ে ঢুকে তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
একই বাজারে ১২ বছর আগে চার খুন
একই বাজারে আবারও প্রকাশ্যে এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের কাছে পুষ্পপাড়া বাজার যেন পুরোনো এক আতঙ্কের নাম। এর আগে ২০১৪ সালের ৩০ মে সন্ধ্যায় এই বাজারেই প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা। চাঞ্চল্যকর সেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও উদ্ঘাটিত হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এক যুগের ব্যবধানে একই স্থানে আবারও গুলিতে দুজন প্রাণ হারানোয় এবং হামলাকারীরা অনায়াসে পালিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
‘পরিবার নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র’
নিহত আব্দুস সালামের ভাই ও পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (চরমপন্থী দল) নেতা আব্দুল কালামের দাবি, তাদের পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ২০১৪ সালে চারজন খুনের ঘটনায়ও আমাদের পরিবারের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল। সেই সময় আমি জেলে থাকা সত্ত্বেও আমাকে আসামি করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই এলাকায় আমরা থাকার কারণে অপরাধীরা চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ করতে পারে না। সে কারণেই আমাদের পরিবারকে টার্গেট করা হচ্ছে।’
অপরাধীদের ধরতে একাধিক ইউনিট মাঠে
এ বিষয়ে পাবনার পুলিশ সুপার (এসপি) আবু আশরাফ জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট একযোগে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, আতাইকুলা অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই চরমপন্থী তৎপরতাসহ নানা অপরাধের জন্য পরিচিত। তবে আগের তুলনায় এখন অপরাধ অনেক কমেছে। পাবনায় যোগদানের পর গত তিন মাসে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম। আশা করছি, খুব দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পারব।