মা ইলিশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে আরোপিত টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই পটুয়াখালীর আলিপুর মৎস্য বন্দরে মাছবোঝাই একের পর এক ট্রলার ভিড়তে দেখা গেছে। স্থানীয় জেলেদের দাবি, এই ট্রলারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে মা ইলিশ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন কিছু ট্রলার সাগরে মাছ শিকার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা সরকারি নির্দেশনা মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে।

সারা দেশে মা ইলিশ রক্ষায় গত ৮ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৬টার দিকে আলিপুর মৎস্য বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, সাগর থেকে মাছবোঝাই ফিশিং ট্রলারগুলো একের পর এক বন্দরে ফিরছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ট্রলারগুলোতে প্রচুর মা ইলিশ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশবোঝাই এসব ট্রলার রাত ১২টার পরপরই শিববাড়িয়া চ্যানেলে নোঙর করে। এরপর সকালে মাছগুলো আলিপুর মৎস্য বন্দরের আড়তে বিক্রির জন্য নিয়ে আসা হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে এসব ট্রলার কীভাবে সাগরে মাছ শিকার করল এবং তা কীভাবে নজরদারির বাইরে থাকল।

নিষেধাজ্ঞা মেনে টানা ২২ দিন মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের অভিযোগ, তারা সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করলেও এই সময়ে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পাননি। অন্যদিকে, কিছু অসাধু জেলে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ শিকার করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।

জেলে বারেক হাং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা সরকারি নিয়ম মেনে ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। কিন্তু এই সময়ে অনেক ট্রলার সাগরে মাছ ধরেছে। আমরা নিয়ম মেনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, আর যারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছে, তারা এখন মাছ বিক্রি করে লাভবান হয়েছে।’

প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে কথা বলে আরেক জেলে সত্তার মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় নদী ও সাগরে প্রশাসনের নজরদারি আরও কঠোর হওয়া দরকার ছিল। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যারা মাছ ধরেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তার মতো নিয়ম মেনে চলা জেলেরা একসময় উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন।

আলিপুর বন্দরে মাছ নিয়ে আসা একটি ফিশিং ট্রলারের জেলে কামরুল স্বীকার করেন, ‘আমরা পেটের দায়ে মাছ ধরতে গেছি। গত ১৫ দিন সাগরে ছিলাম। আজ সকালে মাছ নিয়ে আলিপুর বন্দরে এসেছি। এখানে আড়তে মাছ বিক্রি করব।’

কামরুলের এই স্বীকারোক্তির পর নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ট্রলারটি কীভাবে সাগরে অবস্থান করে মাছ শিকার করল এবং সংশ্লিষ্ট ট্রলারগুলো প্রশাসনের নজরদারির বাইরে ছিল কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এই বিষয়ে পটুয়াখালীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, ‘বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। যারা এ ধরনের কাজ করবে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।’

মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য ছিল ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজননের সুযোগ করে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মাছ শিকারের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে, এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন ও নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, যারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারে জড়িত ছিল, সেই ট্রলারগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। পাশাপাশি শিববাড়িয়া চ্যানেল থেকে আলিপুর মৎস্য বন্দর পর্যন্ত নজরদারি বাড়িয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।