গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর ব্রাজিল জাতীয় দলকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। সেই লক্ষ্যেই গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বিশ্বকাপের পর প্রথম আন্তর্জাতিক বিরতিতে প্রীতি ম্যাচের জন্য যে দল গঠন করা হয়েছিল, সেখান থেকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ১৫ জন খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়া হয়। ২৬ জনের সেই দলে ৮ জন ছিলেন নতুন মুখ।

আগামী মাসে জাপান ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে ব্রাজিলের। বিশ্বকাপের পর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিরতির এই প্রীতি ম্যাচগুলোর জন্য গতকাল রাতে ২৬ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন কোচ আনচেলত্তি। বরাবরের মতোই নতুন খেলোয়াড়দের দলে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আনচেলত্তির এবারের ২৬ জনের দলে ৫ জন নতুন মুখ অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। দলের ১৫ জন খেলোয়াড়ের বয়স ২৩ বছর বা তার কম। এদের মধ্যে ১০ জন গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের স্কোয়াডে ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ বিশ্বকাপ জয়ের একটি ‘ব্লু প্রিন্ট’ তৈরি করতে অভিজ্ঞদের পাশাপাশি তরুণদের দিয়ে একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন কোচ।

সাধারণত অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে দেশগুলো বিশ্বকাপে সেরা দল গঠন করে, যার ফলে দলের গড় বয়স বেশি হয়। উদাহরণস্বরূপ, সর্বশেষ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল ২৯.৬ বছর। তবে বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর তারুণ্যের শক্তি যোগ করতে আনচেলত্তি নতুন পরিকল্পনা করেন। ফলে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে দলের গড় বয়স নেমে এসে দাঁড়ায় ২৪.৪ বছরে। এবার সেই গড় বয়স আরও কমেছে; বর্তমান স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের গড় বয়স মাত্র ২২ বছর!

আনচেলত্তির এই দলের পাঁচ নতুন মুখ হলেন জোনাথন জেসুস, আন্দ্রে লুইজ, মারলন গোমেজ, আলিসন সান্তানা ও অ্যালান। জেসুস ক্রুজেইরোর ডিফেন্ডার এবং চলতি মৌসুমে ক্লাবটির অধিকাংশ ম্যাচে তিনি খেলেছেন। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার অ্যালান গত আগস্টে পালমেইরাস থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়েছেন। গোমেজ শাখতার দনেৎস্কের মিডফিল্ডার এবং একই ক্লাবের উইঙ্গার হলেন সান্তানা। লুইজ করিন্থিয়ান্সের মিডফিল্ডার। এই পাঁচজনই ২২ বছর বা তার কম বয়সী।

তরুণদের জাতীয় দলে ডাকার বিষয়ে আনচেলত্তির ব্যাখ্যা, “প্রতিপক্ষের চেয়ে আমাদের কী দরকার, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া বেশি জরুরি। দল ঢেলে সাজানো আমরা কী চাই। এটাই সেই আদর্শ সময়।”

তিনি আরও বলেন, “২০২৭ পর্যন্ত আমাদের সঠিক পথটা খুঁজে বের করতে হবে। ২০২৮ সালে প্রীতি ম্যাচ, কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দলকে আরও সংহত করে ফেলব আমরা।”

চেলসির নতুন কোচ জাবি আলোনসোর অধীনে এই মৌসুমে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলা উইঙ্গার এস্তেভাও দলে জায়গা ধরে রেখেছেন। ইংলিশ ক্লাবটির হয়ে মাত্র ১৭২ মিনিট মাঠে থাকা ১৯ বছর বয়সী এস্তেভাওকে রাখা প্রসঙ্গে আনচেলত্তি বলেন, “এস্তেভাও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় একজন খেলোয়াড়। বর্তমানে তার চেয়ে ভালো পারফর্ম করছেন এমন খেলোয়াড়ও আছেন, কারণ সে নিয়মিত খেলছে না। আমাদের সঙ্গে তার থাকাটা ইতিবাচক এবং আমরা আশা করি সে তার প্রতিভার ঝলক দেখাতে পারবে।”

লিভারপুলের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক আলিসন বেকারকে এবারও দলের বাইরে রেখেছেন আনচেলত্তি। এর কারণ ব্যাখ্যা করে কোচ বলেন, “তাকে আমাদের পরখ করে দেখার দরকার নেই। তাকে আমরা ভালো জানি। সে সেরা গোলকিপার। কোপা আমেরিকা শুরু হলে তাকে ডাকা হবে। (বাদ পড়া) বাকিদের জন্যও কথাটা প্রযোজ্য। এ মুহূর্তটা হলো পর্যবেক্ষণের, স্কোয়াডে নতুন রক্ত সঞ্চার করার এবং তরুণ খেলোয়াড়দের তাঁদের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে সাহায্য করার।”

ঘরোয়া লিগের শিরোপা লড়াইয়ে থাকা ক্লাবগুলোকে বিবেচনা করে এবার তাদের খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে ডাকা হয়নি। ফলে পালমেইরাস, ফ্ল্যামেঙ্গো ও আতলেতিকো মিনেইরোর মতো ক্লাব থেকে কোনো খেলোয়াড় স্কোয়াডে নেই। তবে ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগে খেলা ছয় ফুটবলার আনচেলত্তির দলে রয়েছেন।

আহত মারকিনিওস বাদে অভিজ্ঞ ভিনিসিয়ুস, এনদ্রিক ও রাফিনিয়াকে দলে রাখা হয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে জানা গিয়েছিল যে, রাফিনিয়া গত আন্তর্জাতিক বিরতিতে চোট নিয়ে ফিরে আসায় বার্সেলোনা তাকে ছাড়তে রাজি ছিল না এবং বিষয়টি ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনকেও (সিবিএফ) জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও আনচেলত্তি তাকে দলে ডেকেছেন। পূর্ণ ফর্মে না ফিরলেও বার্সার সর্বশেষ ‘এল ক্লাসিকো’ ম্যাচে গোল করেছেন রাফিনিয়া।

ব্রাজিল স্কোয়াড: গোলরক্ষক: বেন্তো, লুকাস পেরি, পেদ্রো মরিসকো। ডিফেন্ডার: আর্থুর দিয়াজ, কার্লোস আগুস্তো, দগলাস সান্তোস, গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস, জাইর কুনিয়া, জোনাথন জেসুস, ভ্যান্ডারসন, ভিতর রেইস, ওয়েসলি। মিডফিল্ডার: আন্দ্রে, আন্দ্রে সান্তোস, ব্রুনো গিমারায়েস, দানিলো, গ্যাব্রিয়েল বোনতেম্পো, জোয়াও গোমেজ, মারলন গোমেজ। ফরোয়ার্ড: আলিসন সান্তানা, অ্যালান, এস্তেভাও, রাফিনিয়া, রায়ান, এনদ্রিক ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

আনচেলত্তি নিয়মিত সুযোগ পাওয়া ছয় অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে ‘দলের মেরুদণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন মারকিনিওস, গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস, ব্রুনো গিমারায়েস, দগলাস সান্তোস, রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

সংবাদ সম্মেলনে দলের নিকট-ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে আনচেলত্তি বলেন, “২০২৭ পর্যন্ত আমাদের সঠিক পথটা খুঁজে বের করতে হবে। ২০২৮ সালে প্রীতি ম্যাচ, কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দলকে আরও সংহত করে ফেলব আমরা।”

আগামী ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে সিঙ্গাপুরের জাতীয় স্টেডিয়ামে জাপানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এরপর ১৭ নভেম্বর একই মাঠে স্বাগতিক সিঙ্গাপুরের মুখোমুখি হবে আনচেলত্তির দল।