বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এই ঘটনার সূত্র ধরে তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফ দীর্ঘ প্রায় ছয় ঘণ্টা দীপের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে পিবিআই দীপকে তাদের হেফাজতে নেয়। তাহসিফ সৌরির পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যানুসারে, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ নামের এক যুবক, যিনি তাহসিফের চেয়ে বয়সে ছোট এবং বন্ধুস্থানীয়, তার বাসার নিচে এসে তাহসিফকে ডাকেন। তাহসিফ তখন তার মাকে জানান যে, তিনি দীপের সঙ্গে কথা বলে দ্রুতই বাসায় ফিরে আসবেন। তবে বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ তার মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন এবং দীপও আলাদা একটি মোটরসাইকেলে তার সঙ্গে ছিলেন।
রাত বাড়লেও ছেলে বাসায় না ফেরায় তার মা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু তাহসিফ ফোন ধরেননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মোবাইলে একটি বার্তা আসে, যাতে লেখা ছিল, ‘মা, আসছি’। তবে সেই বার্তার পর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। তাহসিফের এক নিকটাত্মীয় জানিয়েছেন, মায়ের মোবাইলে আসা শেষ ‘ভয়েস মেসেজটি’ শুনে তার মনে হয়নি যে সেটি তাহসিফের কণ্ঠ ছিল।
বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধারের সময় নৌপুলিশ তার হাতঘড়ি ও মানিব্যাগ উদ্ধার করতে পারলেও তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, যেহেতু তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে ছিলেন, তাই তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গতরাতে আহমেদ সাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরে নেওয়া হয়েছে। তারা দুজন কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং সেই সময়ের কার্যক্রম নিয়ে দীপের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, “দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি।”
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, খুব দ্রুতই তাহসিফ সৌরির নিখোঁজ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, যার ডাকে তাহসিফ বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন, সেই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ দাবি করেছেন যে, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তারা মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য একটি গ্যারেজে যান। সেখান থেকে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে তারা দুজন নিজ নিজ মোটরসাইকেলে ফেরার পথে ছিলেন। তিনি জানান, উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকা পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ছিলেন এবং রাত আনুমানিক ১২টার দিকে তারা আলাদা হয়ে যান। এরপর তিনি নিজ বাসায় ফিরে যান এবং তাহসিফের বিষয়ে আর কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। দীপ জানান, তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং তার বাসা রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এলাকায়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে অবহিত করেন। এরপর টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। মরদেহের সাথে পাওয়া হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে সেটি তাহসিফ সৌরির বলে শনাক্ত করা হয়।
বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো রহস্যজনক। তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের এই মৃত্যু স্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন এবং এটিকে মৃত্যু হত্যা বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।