দূর থেকে তাকালেই চোখে পড়ে বাজারের ওপর বিস্তৃত এক বিশাল সবুজ বৃক্ষ। দোকানপাটের ভিড় ঠেলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এক প্রাচীন তেঁতুলগাছের ডালপালা। কোনো ডাল ঢুকে পড়েছে দোকানের ভেতরে, আবার কোনোটি স্পর্শ করেছে ছাদ। এই গাছটিই যেন পুরো এলাকার প্রাণকেন্দ্র।
রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের তেঁতুলতলা বাজারের পুরো পরিচয় জড়িয়ে আছে এই বিশেষ গাছটির সঙ্গে। গাছটির সঠিক বয়স কত, তা নিশ্চিত করে বলতে পারে না কেউ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, গাছটির বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনেই তারা এই ধারণায় পৌঁছেছেন। গাছটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা রকম প্রচলিত বিশ্বাস ও ধারণা রয়েছে।
বাজারের দোকানপাটের দিকে তাকালেই বোঝা যায় এই তেঁতুলগাছটির সঙ্গে স্থানীয় জনবসতির গভীর সম্পর্ক। চা-দোকানি মো. মজদুল দীর্ঘ ১৩-১৪ বছর ধরে এখানে দোকান করছেন। তাঁর দোকানের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে গাছের একটি ডাল।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই বিশাল গাছটির নাম থেকেই বাজারের নামকরণ হয়েছে 'তেঁতুলতলা'। বাজারটির বয়স এখন চার দশকেরও বেশি। শুরুর দিকে এখানে বসতি ও দোকানের সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং দোকানগুলো ছিল মাটির তৈরি। সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং বাজারটি সম্প্রসারিত হয়।
এক সময় এই তেঁতুলগাছটির চারপাশে ছিল ঘন জঙ্গল। কালের বিবর্তনে সেই জঙ্গলের জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতি ও দোকানপাট। বর্তমানে গাছের গোড়াটি ইট দিয়ে বাঁধানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. ওয়াজিদের বয়স প্রায় ৯০ বছর। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই গাছটিকে দেখে আসছেন।
গাছের তেঁতুল বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয় না। স্থানীয় বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী বাবু মণ্ডল জানান, যার যত ইচ্ছা এই গাছ থেকে তেঁতুল পেড়ে খেতে পারেন। ছোটবেলায় গাছে উঠে তেঁতুল পাড়ার স্মৃতি এখনও অমলিন তাঁর মনে। তিনি বলেন, “রাজশাহীতে কোথাও তেঁতুলতলা বাজারের কথা বললে মানুষ এই জায়গা চিনতে পারে।”
গাছটির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আত্মিক সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাজারের দৃশ্যপটে। ৫০ বছর বয়সী চা-দোকানি মো. মজদুল বলেন, “দোকান নির্মাণের অনেক আগে থেকেই ডালটি ওই জায়গায় ছিল। ডাল কাটা হয়নি। পরে আশপাশে দোকান ও ভবন গড়ে উঠেছে।” গাছের গোড়া পরিষ্কার রাখা এবং শুকনো ডাল সরিয়ে ফেলার মতো যত্নের কাজগুলো স্থানীয় লোকজনই স্বেচ্ছায় করে থাকেন। রাতে এই গাছের ডালে বকসহ নানা প্রজাতির পাখি এসে আশ্রয় নেয়।
তবে আগে যে পরিমাণ তেঁতুল ধরত, এখন তার ফলন অনেকটাই কমে গেছে। স্থানীয়দের মতে, এর পেছনে রয়েছে আশপাশের ইটভাটার ধোঁয়ার প্রভাব। মজদুল জানান, এলাকার আশেপাশে প্রায় ২৪টি ইটভাটা রয়েছে। এই ভাটার ধোঁয়ায় গাছের পাতা ঝরে পড়ে। শুধু এই তেঁতুলগাছ নয়, এলাকার আম ও কাঁঠালসহ অন্যান্য ফলের গাছের ফলনও এতে মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এই প্রাচীন ও বিশাল তেঁতুলগাছটি দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই বাজারে ভিড় করেন। স্থানীয় মানুষের একমাত্র চাওয়া, গাছটি যেন সুস্থ থাকে এবং বছরের পর বছর এভাবেই সবাইকে শীতল ছায়া দিয়ে যায়।