দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার জনবল নিয়োগ দিতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এই নিয়োগের আওতায় অস্থায়ীভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ২ হাজার ২৬ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ১ হাজার ৪০৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। মূলত শহরের বর্জ্য অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং মশকনিধন কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে এই মোট ৩ হাজার ৪৩০ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। গত ১২ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এই নিয়োগ প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে।
তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের অনিয়ম রোধে দুই সিটি করপোরেশনকে সতর্ক করে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওই চিঠিতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের পাঠানো ওই চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল জরুরি প্রয়োজন এবং প্রকৃত চাহিদার কথা বিবেচনা করেই দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনোভাবেই নতুন কর্মী নেওয়া যাবে না। এছাড়া অনুমোদিত সংখ্যার (যেমন দক্ষিণ সিটিতে ২ হাজার ২৬ জন) বাইরে অতিরিক্ত কোনো জনবল নিয়োগ করা যাবে না। চিঠিতে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই মাসিক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া যাবে না, অবশ্যই দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করাতে হবে। নতুন এই কর্মীদের মজুরির অর্থ সিটি করপোরেশনের নিজস্ব বাজেট থেকে সংস্থান করতে হবে; এই জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া যাবে না। নিয়োগে কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম দেখা দিলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষই দায়ী থাকবেন। পাশাপাশি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের মজুরির ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের ‘দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণ’ নীতিমালা অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরির হার ৮০০ টাকা। সেই হিসেবে মাসে একজন শ্রমিকের মোট মজুরি হবে ২৪ হাজার টাকা। উল্লেখ্য, এই নীতিমালায় অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকায় একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭৫০ টাকা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বর্তমান জনবল দিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের দৈনন্দিন সেবা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব, তাই আরও কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। তবে অতীতে দুই সিটিতেই জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর নজির রয়েছে। রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজেদের পছন্দের লোক নিয়োগের চেষ্টা করেন। এমনকি চাকরি স্থায়ী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনেকের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক এই জনবল কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত করেনি দুই সিটি করপোরেশন। আগে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে আউটসোর্সিং বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নেওয়া হতো। তবে গত ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করেছে। সংশোধিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরগুলো এখন সরাসরি লোক নিয়োগ করতে পারবে। এছাড়া কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ চাইলে অর্থ বিভাগের অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আইআইএফসির (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি) মাধ্যমেও নিয়োগ দিতে পারবে।
গত সোমবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকা মহানগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণবিষয়ক এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার জানান, সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থাগুলো চাইলে নিজেরাও সরাসরি এই জনবল নিয়োগ দিতে পারবে।
এই বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খয়বর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কী প্রক্রিয়ায় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন পুরোপুরি সতর্ক রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, সে অনুযায়ী কাজ করবে সিটি করপোরেশন।”
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁদের পর্যাপ্ত জনবলের তীব্র প্রয়োজন রয়েছে। অনেক আগেই বাড়তি জনবলের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় অনুমোদিত নথিটি এখনো তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঢাকায় প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়, তা দ্রুত অপসারণ করতে আরও জনবল প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতেও লোকবল বাড়ানো জরুরি। তবে এই নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।” তাঁর পরামর্শ হলো, দুই সিটি করপোরেশনের উচিত একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা, যারা প্রভাবমুক্ত থেকে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবে।