নদীর মাছ ধরে সংসার চালানো বাবার অভাবী পরিবারের সংগ্রাম আর লড়াকু মানসিকতার জয়। সেই প্রতিকূলতাকে জয় করে জাতীয় ব্যাডমিন্টনের শিরোপা জিতে নিলেন বাগেরহাটের মেয়ে লিকা পোদ্দার। জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় শিরোপা জয়ের পর ২৪ বছর বয়সী এই শাটলার ভিডিও কলে কথা বলেন মোংলায় অবস্থানরত তাঁর মায়ের সঙ্গে। সাফল্যের এই মুহূর্তে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন লিকা, আর মেয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যে আনন্দাশ্রু ঝরল মায়ের চোখে। মা ও মেয়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের সেই মুহূর্তটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত আবেগঘন।
লিকার হাতে তখন জাতীয় চ্যাম্পিয়নের ট্রফি। তবে এই শিরোপা কেবল একটি পুরস্কার নয়, বরং এর পেছনে মিশে আছে পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম, মায়ের লালিত স্বপ্ন এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার এক কঠিন লড়াই। ম্যাচ শেষে মুক্তকণ্ঠকে লিকা বলেন, ‘মা–বাবার কষ্টটা আমি বুঝি। তাই অনেক কষ্ট সহ্য করেও খেলাটা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি জিতলে যদি তাঁরা (বাবা–মা) খুশি হন, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
পল্টনের উডেন ফ্লোর জিমনেসিয়ামে অনুষ্ঠিত ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককের ফাইনালে মুখোমুখি হন নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার লিকা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক চ্যাম্পিয়ন উর্মি আক্তার। তিন গেমের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে উর্মিকে ২২-২০, ১১-২১ ও ২১-১৮ পয়েন্টে পরাজিত করে ক্যারিয়ারের প্রথম সিনিয়র জাতীয় শিরোপাটি জয় করেন লিকা। এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত লিকা বলেন, ‘প্রথমবার ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন হব, ভাবিনি। এটা সত্যি আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।’
জাতীয় পর্যায়ে এই সাফল্যের পর এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রমাণ করার লক্ষ্য নিয়েছেন লিকা। দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভালো ফল করে সম্মান বয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন এই নতুন চ্যাম্পিয়ন। তিনি বলেন, ‘এই শিরোপা আমাকে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দেবে। সামনে আরও পরিশ্রম করতে চাই। দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভালো করতে চাই।’
ফাইনালে লড়াইটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। প্রথম গেমে ২২-২০ পয়েন্টে জিতে এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয় গেমে ঘুরে দাঁড়ান অভিজ্ঞ উর্মি। ১১-২১ পয়েন্টে সেই গেমটি হেরে লিকাকে সমতায় ফিরতে হয়। ফলে শিরোপার ভাগ্য নির্ধারিত হয় শেষ গেমের লড়াইয়ে। স্নায়ুর কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ২১-১৮ পয়েন্টে জয় ছিনিয়ে নেন লিকা এবং নিজেদের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তবে লিকার এই আনন্দের বিপরীতে ছিল উর্মির হতাশা। ২০২২ ও ২০২৩ সালের নারী এককের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবারও শিরোপার লড়াইয়ে উঠেছিলেন তিনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় ধরে রাখতে পারেননি। ম্যাচ শেষে নিজের চেষ্টা ও হতাশার কথা জানিয়ে উর্মি বলেন, ‘আমি আমার চেষ্টা করেছি। শেষ পর্যন্ত লড়েছি। আমি বলব, এটা আমার জন্য দুর্ভাগ্য। ম্যাচটা জিততে পারিনি।’
অন্যদিকে, পুরুষ এককের ফাইনালিস্ট সিবগাত উল্লাহ চোটের কারণে খেলতে না পারায় ওয়াকওভারের মাধ্যমে শিরোপা জিতেছেন রাজিন আহমেদ।