এক হাতে পাঠ্যবই, আর অন্য হাতে ব্যাডমিন্টনের ব্যাট। চোখে ভবিষ্যৎ গড়ার রঙিন স্বপ্ন আর বুকে অভাবকে জয় করার অদম্য সাহস নিয়ে এগিয়ে চলছে এক কিশোরী। বাবা-মাকে হারিয়ে দাদির স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠা এই কিশোরীর দীপ্ত পথচলা আজ অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কথা বলছি রাজশাহী আলোর পাঠশালার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা পারভীন মিষ্টির সম্পর্কে।

শৈশবেই বাবাকে হারান মিষ্টি। এরপরই তার পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক অনটন। দাদির আদর ও আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা এই একমাত্র সন্তানটি জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও টানাপোড়েনের মুখোমুখি হলেও কখনো দমে যায়নি। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সে মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্ট পরিচালিত রাজশাহী আলোর পাঠশালায় পড়াশোনা শুরু করে। মিষ্টির কাছে পড়াশোনা মানে কেবল শ্রেণিক্রম পার হওয়া নয়, বরং এটি তার কাছে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের একমাত্র শক্তিশালী হাতিয়ার।

জীবনের রূঢ় বাস্তবতা মিষ্টিকে খুব অল্প বয়সেই পরিণত ও পরিপক্ব করে তুলেছে। তার বড় স্বপ্ন হলো ভবিষ্যতে একজন পুলিশ অফিসার হওয়া। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে মানুষের পাশে থাকার পাশাপাশি সে চায় নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের দীর্ঘদিনের অভাব-অনটন ও দুঃখ-কষ্ট দূর করতে।

মিষ্টির স্বপ্নের পরিধি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে খেলার মাঠেও। প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ 'নতুন কুঁড়ি' থেকেই শুরু হয় তার ব্যাডমিন্টনের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম, অনুশীলন আর খেলার প্রতি তীব্র অনুরাগের ফলে মিষ্টি ইতিমধ্যেই জেলা পর্যায়ে ব্যাডমিন্টন খেলছে। খেলায় আরও বড় ধরনের সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সে প্রতিদিন নিজেকে প্রস্তুত করে তুলছে।

মিষ্টির এই প্রতিভার বিকাশ এবং স্বপ্নের পথে আলোর দিশারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে রাজশাহী আলোর পাঠশালা। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এই বিদ্যালয়টি কেবল শিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং প্রতিকূল পরিবেশ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও স্বপ্ন দেখার এই অদম্য সাহসের নাম সানজিদা পারভীন মিষ্টি। সময়ের পরিক্রমায় সে জেলা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাবে নাকি পুলিশ অফিসার হয়ে দেশের সেবা করবে—সেই উত্তর সময়ের হাতে। তবে প্রতিকূলতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে দৃষ্টান্ত সে তৈরি করেছে, তা ইতিমধ্যেই অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য এক আশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।