সিলেটে ছয় বছর আগে পুলিশি হেফাজতে রায়হান উদ্দিন আহমদ হত্যা মামলায় প্রধান আসামি পুলিশ থেকে সাময়িক বরখাস্তকৃত উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় অভিযুক্ত কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুনসী আব্দুল মজিদ এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে আরও তিন আসামিকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন এসআই হাসান উদ্দিন, পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহি এবং এসআই আকবরের আত্মীয় ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান। রায়ের সময় হাজতে থাকা একমাত্র আসামি আশেক এলাহি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন জানান, “মামলায় ৬৯ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬১ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট।”
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে আকবর হোসেন, হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এই অর্থ অনাদায়ে তাঁদের আরও তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাত বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আসামিদের ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে এবং অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের পরদিন তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রী মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে সিলেট মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি অভিযোগের সত্যতা পায়। এর ফলে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেনসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত চালিয়ে কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। ২০২১ সালের ৫ মে পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। অভিযুক্তদের মধ্যে পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে থাকলেও আবদুল্লাহ আল নোমান শুরু থেকেই পলাতক ছিলেন।
রায়হানের মা সালমা বেগম রায়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও দণ্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর মনের শান্তি হবে না বলে জানান। তিনি বলেন, “দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মনের শান্তি হবে না। আকবরের ফাঁসির রায় হয়েছে; কিন্তু তিনি তো পালিয়ে গেছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র একজন হাজতে রয়েছেন। বাকিরা ধাপে ধাপে আদালত থেকে জামিন নিয়ে পালিয়েছেন।” তাঁরা যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁদের আটক করতে দেশবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন রায়হানের মা।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান আকবর হোসেন এবং ১১ আগস্ট সিলেট কারাগার থেকে মুক্তি পান। ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ পিটিশন ফর লিভ টু আপিল দায়ের করলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ উচ্চ আদালতের আদেশ স্থগিত করেন এবং আকবর হোসেনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। তবে আকবর আর আত্মসমর্পণ করেননি। সালমা বেগমের অভিযোগ, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরপরই আকবর হোসেন ভূঁইয়া ভারতে পালিয়ে গেছেন। আশেক এলাহি ছাড়া বাকি আসামিরাও পর্যায়ক্রমে জামিন নিয়ে কারামুক্ত হওয়ার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।
অন্যদিকে, সাত বছর করে দণ্ড পাওয়া আশেক এলাহি ও হাসান উদ্দিনের আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন রায়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। সাক্ষ্য লুকানোর অভিযোগে তাঁদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আদালত যে অভিযোগে আশেক এলাহি ও হাসান উদ্দিনকে সাজা দিয়েছেন; আমরা আশা করি, উচ্চ আদালতে যাওয়ার পরে সেটি টিকবে না। আমরা আপিল করব। আশা করছি, আপিলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বেকাসুর খালাস পাবেন।”
মামলার রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, আটক অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার অধিকার পুলিশ কিংবা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই। কোনো ব্যক্তি দুর্ধর্ষ অপরাধী হলেও বিচার ছাড়া তাঁকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। আদালত আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হয়।
আটক ব্যক্তির শরীর ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিশেষ দায়িত্ব আটককারী কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায় উল্লেখ করে আদালত বলেন, “শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়, তথ্য সংগ্রহ কিংবা কথিত অপরাধের শাস্তি দেওয়া আইনের শাসনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।”
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা শুধু ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের প্রতি ন্যায়বিচার নয়; ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখারও পূর্বশর্ত।