ইরাকের মাটিতে বাংলাদেশের তীরন্দাজদের অভাবনীয় সাফল্য। একের পর এক লক্ষ্যভেদে এশিয়া কাপ আর্চারির দ্বিতীয় পর্বে পদকের উৎসব করেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। প্রতিযোগিতার শেষ দিনে বন্যা আক্তারের ব্যক্তিগত স্বর্ণপদক জয়ের ফলে বাংলাদেশের মোট স্বর্ণপদকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনটিতে। এর সঙ্গে তিনটি রুপা ও চারটি ব্রোঞ্জ মিলিয়ে সর্বমোট ১০টি পদক সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ। পদক সংখ্যায় সমান হলেও রুপার হিসাবে এগিয়ে থেকে শীর্ষস্থান দখল করেছে কাজাখস্তান। আর পদকতালিকায় দ্বিতীয় হয়ে আসর শেষ করেছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ইরাকের সুলাইমানিয়ায় এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং আর্চারি টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি ঘটে। প্রতিযোগিতার শেষ দিনে বাংলাদেশের আর্চাররা দুটি সোনা, একটি রুপা ও চারটি ব্রোঞ্জ জিতেছেন। এর আগের দিন দলগত তিনটি ফাইনাল ম্যাচ থেকে একটি সোনা ও দুটি রুপা এসেছিল। সব মিলিয়ে পাঁচ দিনের এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের মোট পদকসংখ্যা ১০-এ পৌঁছেছে।
দিনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত সাফল্যটি এনে দেন বন্যা আক্তার। নারী কম্পাউন্ড এককের ফাইনালে কাজাখস্তানের মিলানা বুরলেভাকে ১৪৫-১৪৩ পয়েন্টে পরাজিত করে স্বর্ণপদক জয় করেন তিনি। অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর শেষ মুহূর্তে মাত্র দুই পয়েন্টের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন এই বাংলাদেশি আর্চার।
এর আগে নারী কম্পাউন্ড দলগত ইভেন্টেও সোনা জিতেছিলেন বন্যা আক্তার। ফলে এবারের আসরে বাংলাদেশের মোট তিন স্বর্ণপদকের দুটিতেই তাঁর অবদান রয়েছে। পাশাপাশি কম্পাউন্ড মিশ্র দলগত ইভেন্টে রুপাও জিতেছেন তিনি। অর্থাৎ দুটি সোনা ও একটি রুপাসহ মোট তিনটি পদক জয়ে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন বন্যা।
বৃহস্পতিবারই পুরুষদের রিকার্ভ দলগত ইভেন্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বর্ণপদকটি আসে। আবদুর রহমান আলিফ, সাগর ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল মোহাম্মদ রাফিকে নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ দল ফাইনালে কাজাখস্তানকে ৬-২ সেট পয়েন্টে পরাজিত করে।
তবে ফাইনালের শুরুটা খুব একটা সুখকর ছিল না বাংলাদেশের জন্য। প্রথম সেটে ৫০-৫৩ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। তবে এরপরই দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান আলিফ ও তাঁর সতীর্থরা। দ্বিতীয় সেটে ৫৫-৫৪ এবং তৃতীয় সেটে ৫৫-৫২ ব্যবধানে জয় পান তাঁরা। চতুর্থ সেটেও ৫২-৫১ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে ৬-২ সেট পয়েন্টের জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
এর আগে বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম সোনাটি জিতেছিলেন বন্যা আক্তার, শ্রীপর্ণা বিশ্বাস ও কুলসুম আক্তার মনিকে নিয়ে গঠিত নারী কম্পাউন্ড দল। ফাইনালে কাজাখস্তানকে ২৩০-২২০ পয়েন্টে পরাজিত করেন তাঁরা।
সেই ফাইনালে শুরু থেকেই দাপট দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। চারটি এন্ডে বাংলাদেশের স্কোর ছিল যথাক্রমে ৫৭, ৫৭, ৫৮ ও ৫৮। বিপরীতে কাজাখস্তানের স্কোর ছিল ৫৫, ৫২, ৫৬ ও ৫৭। ফলে ১০ পয়েন্টের ব্যবধানে সোনার লড়াই জিতে নেন বাংলাদেশের এই তিন নারী আর্চার।
স্বর্ণপদকের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও দলগত বিভিন্ন ইভেন্টে রুপার পদকও এসেছে বাংলাদেশের ঝুলিতে। বৃহস্পতিবার নারী রিকার্ভ এককের ফাইনালে ইরানের মোবিনা ফাল্লাহর কাছে ৬-৪ সেট পয়েন্টে হেরে রুপা জেতেন সাইমা সালাহউদ্দিন।
এর আগে বুধবার পুরুষদের কম্পাউন্ড দলগত ইভেন্টে রুপা পেয়েছিলেন হিমু বাছাড়, তরিকুল ইসলাম ও নওয়াজ আহমেদ রাকিব। ফাইনালে কাজাখস্তানের কাছে ২২৪-২৩০ পয়েন্টে হেরে যান তাঁরা।
কম্পাউন্ড মিশ্র দলগত ইভেন্টেও কাজাখস্তানের বিপক্ষে স্বর্ণপদকের লড়াইয়ে নেমেছিলেন বন্যা আক্তার ও নওয়াজ আহমেদ রাকিব। তবে ১৪২-১৫৩ পয়েন্টে হেরে রুপা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাঁদের।
চারটি ব্রোঞ্জপদকের মধ্যে দুটি এসেছে কম্পাউন্ড ব্যক্তিগত ইভেন্ট থেকে। পুরুষ এককে সতীর্থ তরিকুল ইসলামকে ১৪৫-১৩৯ পয়েন্টে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জেতেন নওয়াজ আহমেদ রাকিব। নারী এককে কাজাখস্তানের আয়াজান ঝাকসিলিককে ১৪৩-১৩৯ পয়েন্টে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করেন কুলসুম আক্তার মনি।
বৃহস্পতিবার রিকার্ভ পুরুষ এককে আরেকটি ব্রোঞ্জ জেতেন আবদুর রহমান আলিফ। আজারবাইজানের মাহাম্মাদালি আলিয়েভকে ৭-৩ সেট পয়েন্টে হারিয়ে ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক নিশ্চিত করেন তিনি। এর আগে পুরুষদের রিকার্ভ দলগত ইভেন্টে সোনা জেতানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইভেন্টেও পদক জিতে দুটি পদক নিয়ে আসর শেষ করেন আলিফ।
অন্যদিকে রিকার্ভ নারী দলগত বিভাগে ব্রোঞ্জ পেয়েছে সাইমা সালাহউদ্দিন, সোনালী রায় ও শিমু সিমা আক্তারকে নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ দল। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৬-০ সেট পয়েন্টে হারিয়েছেন তাঁরা।
তবে রিকার্ভ মিশ্র দলগত ইভেন্টে আরেকটি ব্রোঞ্জ জয়ের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের। সাইমা সালাহউদ্দিন ও আবদুর রহমান আলিফকে নিয়ে গঠিত দলটি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে কাজাখস্তানের কাছে ৫-৩ সেট পয়েন্টে হেরে যায়।
সব মিলিয়ে ১০টি পদক নিয়ে প্রতিযোগিতা শেষ করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে তিনটি সোনা, তিনটি রুপা ও চারটি ব্রোঞ্জ। দলগত ইভেন্টে এসেছে দুটি সোনা, দুটি রুপা ও একটি ব্রোঞ্জ। ব্যক্তিগত ইভেন্টে এসেছে একটি সোনা, একটি রুপা ও তিনটি ব্রোঞ্জ।
সমান ১০টি পদক জিতেছে কাজাখস্তানও। তাদের সংগ্রহ তিন সোনা, পাঁচ রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ। দুই দেশের সোনার সংখ্যা সমান হলেও রুপার সংখ্যা বেশি থাকায় পদকতালিকার শীর্ষস্থান পেয়েছে কাজাখস্তান। দ্বিতীয় স্থানে বাংলাদেশ। তৃতীয় স্থানে থাকা ইরানের সংগ্রহ দুটি সোনা ও একটি রুপা।
এবারের এশিয়া কাপ আর্চারির দ্বিতীয় পর্বে ১৯টি দেশের ১০৬ জন আর্চার অংশ নিয়েছেন। তবে দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন ও জাপানের মতো এশিয়ার কয়েকটি শক্তিশালী দেশ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি। ফলে মহাদেশের সব শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে লড়তে হয়নি বাংলাদেশের আর্চারদের।
বিশেষ করে নারী কম্পাউন্ড দলগত ইভেন্টে অংশ নিয়েছিল মাত্র চারটি দল। ফলে পদকের লড়াইয়ে সরাসরি সেমিফাইনাল থেকে অভিযান শুরু করার সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের আর্চাররা। তবে ফাইনালে কাজাখস্তানকে ১০ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন বন্যা-শ্রীপর্ণারা।