টেস্ট ক্রিকেটের বয়স যতটা, উইলফ্রেড রডসের জীবনকালও ছিল প্রায় ততটাই দীর্ঘ। পার্থক্য শুধু এই যে, টেস্ট ক্রিকেট আজও প্রাণবন্ত হয়ে টিকে আছে, আর রডস ৫৩ বছর আগেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তবে ৯৫ বছর ২৫২ দিন জীবন অতিবাহিত করার পর মৃত্যুতে আফসোস করার কিছু নেই। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৫৮টি সেঞ্চুরি আর টেস্ট ক্রিকেটে ২টি সেঞ্চুরির মাধ্যমে তিনি জীবনের ইনিংসেও যেন এক অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করেছিলেন।
ক্রিকেটের কথা উঠলে অনেকেই দাড়িওয়ালা সেই বিখ্যাত চিকিৎসক ডব্লিউ জি গ্রেসের কথা ভাবেন। তবে ক্রিকেটে বয়সের কথা উঠলে উইলফ্রেড রডসের নামটাই সবার আগে আসা উচিত। গ্রেসের চেয়ে ২৮ বছরের বেশি আয়ুষ্কাল রডসের অনুকূলে ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, টেস্ট ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ে ‘বুড়ো বয়সে’ শিরোনামের যে পাতাটি রয়েছে, সেখানে রডসের নামই সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে।
এখানেই একটি প্রশ্ন জাগে—৫২ বছর বয়সে এসে একজন মানুষ কী করতে চান বা কী করা সম্ভব বলে মনে করেন? একেক জনের উত্তর একেক রকম হতে পারে, তবে কারও উত্তরেই ‘টেস্ট ক্রিকেট খেলতে চাই’ কথাটি থাকার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ সাধারণ ধারণায় ৫২ বছর বয়সে টেস্ট খেলা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়।
কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন রডস। ৫২ বছর ১৬৫ দিন বয়সে তিনি টেস্ট খেলতে মাঠে নেমেছিলেন। সেটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের ৫৮তম এবং সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচ। সেই বয়সে এসেও তিনি খুব খারাপ পারফরম্যান্স করেননি। ব্যাটিংয়ে দুই ইনিংসেই তিনি অপরাজিত ছিলেন। যদিও রান সংখ্যা ছিল সামান্য—৮ ও ১১। তবে মনে রাখতে হবে, তিনি ১০ নম্বরে ব্যাটিং করতে নেমেছিলেন; ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেলে তাঁর করার মতো খুব বেশি কিছু ছিল না।
বোলিংয়ে দুই ইনিংসে ১টি করে উইকেট শিকার করেন তিনি। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ব্যাটসম্যানরা তাঁর বলে কতটা হিমশিম খেয়েছিলেন, তা বোলিং ফিগারই বলে দেয়। দুই ইনিংসেই তিনি ওভারের চেয়ে কম রান দিয়েছেন। প্রথম ইনিংসে ২০.৫ ওভারে দিয়েছেন মাত্র ১৭ রান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ২৪ ওভারে দিয়েছেন ২২ রান।
পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় বিষয় হলো তাঁর মাঠে নামার সাহস। কিছু না করতে পারলেও খেলতে নামাই ছিল তাঁর আসল কীর্তি। টেস্ট ক্রিকেটে কিছু রেকর্ডকে বলা হয় অবিনশ্বর, যেমন ব্র্যাডম্যানের ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড় কিংবা জিম লেকারের এক টেস্টে ১৯ উইকেট। সবচেয়ে বেশি বয়সে টেস্ট খেলার রেকর্ডটিকেও সেই তালিকায় রাখা যায়। এই অনন্য রেকর্ডের কারণেই রডস ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন।
তবে কেবল বয়সের কারণেই তিনি অমর নন, তাঁর ক্রিকেটীয় কীর্তিও ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৮৯৯ সালে প্রথম টেস্ট খেলেছিলেন তিনি এবং ১৯৩০ সালে শেষ। প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারটি ছিল আরও এক বছর দীর্ঘ। হিসাব করলে দেখা যায়, দীর্ঘ ৩২ বছরের এক অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ার ছিল তাঁর।
জীবনের শেষ দিকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন রডস। তা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত ক্রিকেট মাঠে যেতেন। শোনা যায়, ব্যাটে বল লাগার শব্দ শুনেই তিনি বলে দিতে পারতেন শটটি কেমন হয়েছে।
টেস্টে ২টি সেঞ্চুরিসহ তাঁর মোট রান ২ হাজার ৩২৫ এবং বাঁহাতি স্পিনে নিয়েছেন ১২৭টি উইকেট। একজন স্পিনার থেকে অলরাউন্ডার হয়ে ওঠার গল্পটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। তিনি ১১ নম্বরে ব্যাটিং শুরু করে পরবর্তীতে জ্যাক হবসের ওপেনিং পার্টনার হয়েছিলেন। ব্যাটিং পজিশন ১ থেকে ১১—সবখানেই তাঁর খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। ক্রিকেট ইতিহাসে এমন অভিজ্ঞতা আর মাত্র তিনজনের আছে (অস্ট্রেলিয়ার সি গ্রেগরি, ভারতের ভিনু মানকড় ও ইংল্যান্ডের বেন স্টোকস)।
রডসের প্রকৃত মহিমা বুঝতে হলে তাঁর প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারের দিকে তাকাতে হবে। প্রায় ৪০ হাজার রান এবং ৪,২০৪টি উইকেট। এই উইকেট সংখ্যা আজও একটি রেকর্ড, কারণ অন্য কোনো বোলারের চার হাজার উইকেট নেই। সবচেয়ে বেশি বয়সে টেস্ট খেলার মতো এই রেকর্ডটিও তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে।
রডসের শেষ টেস্টটি কিংস্টনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরির জন্য বিখ্যাত। প্রথম ইনিংসে ইংলিশ ওপেনার অ্যান্ডি স্যান্ডহাম ৩২৫ রান করেছিলেন এবং দ্বিতীয় ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরিও করেন। তবে রহস্যময় বিষয় হলো, সেটিই ছিল স্যান্ডহামের শেষ টেস্ট।
আজ উইলফ্রেড রডসের জন্মবার্ষিকী। কততম জন্মবার্ষিকী, তা পাঠক নিজেই হিসাব করে নিতে পারেন। ওই ম্যাচে ইংল্যান্ড দলে রডস ছাড়াও বয়সের হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করা আরও একজন ছিলেন—জর্জ গান। টেস্ট শুরুর দিন তাঁর বয়স ছিল ৫০ বছর ৩০৩ দিন। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে এই দুই প্রবীণ ক্রিকেটার মিলে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ওপেনার ক্লিফোর্ড রোচকে আউট করেছিলেন (ক গান ব রোডস)। টেস্ট ক্রিকেটে রডসের শেষ উইকেটটিতে বোলার ও ফিল্ডারের মিলিত বয়স ছিল ১০৩ বছর—যা অবিনশ্বর রেকর্ডের তালিকায় যুক্ত করা যায়।
দৃষ্টিশক্তি কমতে কমতে শেষ বয়সে একেবারে অন্ধই হয়ে গিয়েছিলেন রোডস। তারপরও নিয়মিতই ক্রিকেট মাঠে যেতেন। ব্যাটে বল লাগার আওয়াজ শুনেই নাকি বলে দিতে পারতেন, শটটা কেমন হলো!
হয়তো মনে প্রশ্ন জাগছে, হঠাৎ করে কেন উইলফ্রেড রডসের কথা বলা হলো? কারণ আজ তাঁর জন্মবার্ষিকী। শুরুতেই বলা হয়েছিল, টেস্ট ক্রিকেট আর রডসের বয়স সমান। ১৮৭৭ সালে টেস্ট ক্রিকেটের জন্ম হয়েছিল, যা অনেকেরই জানা।
শুভ জন্মদিন, উইলফ্রেড রোডস!