ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় পুলিশের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে পুলিশি পাহারা থাকা সত্ত্বেও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

ফেসবুকে একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দিয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়। এর জের ধরে রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের তিন ভাইয়ের বাড়িতে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, পুরোনো ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার সাথে জড়িত দুজনকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে।

গত সোমবার সন্ধ্যায় পীরগঞ্জ উপজেলার চককরিম কাশিমপুর গ্রামে এই হামলার ঘটনাটি ঘটে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগের ঘটনাটি অনেক আগের। গাজীপুরে এক তরুণের বক্তব্যের ভিডিও তখন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ভিডিও এখন আবার ফেসবুকে পোস্ট করা হলে ক্ষুব্ধ লোকজন তরুণের বাড়ির আশপাশে জড়ো হন। এরপর সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা ঘরের টেলিভিশন, ফ্রিজ ও আসবাব ভাঙচুর করেন এবং তিনটি ছাগল নিয়ে যান। ঘরে রাখা ১০ হাজার টাকাও নিয়ে গেছেন বলে তিনি শুনেছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নুরুল আমিন আরও বলেন, “কেউ অপরাধ করলে আইনে শাস্তির সুযোগ আছে। আইন নিজের হাতে কেউ তুলে নিতে পারে না।” ভবিষ্যতে যাতে সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান।

পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত চককরিম কাশিমপুর গ্রাম। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে গ্রামের প্রবেশমুখে সড়কের পাশে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। সেখান থেকে কিছুটা এগোলেই পাওয়া যায় ভুক্তভোগী তিন ভাইয়ের বাড়ি।

ভুক্তভোগী তিনটি পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যে তরুণের (২২) বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন। সেখানে থাকাকালীন এক বন্ধুর সাথে তাঁর কথোপকথনের একটি ভিডিও পাঁচ-ছয় মাস আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ভিডিওতে ধর্ম অবমাননামূলক মন্তব্য ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সে সময় গাজীপুরের ওই এলাকায় কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি শান্ত হয়। প্রায় তিন মাস আগে ওই তরুণ গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন। সম্প্রতি সেই পুরোনো ভিডিও থেকে কেবল তাঁর বক্তব্যের অংশটি পুনরায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে তিনটি বাড়িতে হামলা চালানো হয়।

চককরিম কাশিমপুর গ্রামে মোট ৪৮টি হিন্দু পরিবারের বসবাস এবং লোকসংখ্যা দুই শতাধিক। ঘটনার পর থেকে পুরো গ্রামের মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত তরুণের মা জানান, গাজীপুরের ঘটনার পর ছেলে বাড়ি ফিরলে তাঁর বাবা রাগারাগি ও মারধর করেন। এতে অভিমান করে প্রায় তিন মাস আগে ছেলে বাড়ি ছেড়ে চলে যান এবং এরপর আর ফেরেননি। তিনি অভিযোগ করেন, সোমবার সকাল ১০টার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি বাড়িতে এসে তাঁর ছেলের খোঁজ করেন। দুপুরে পুনরায় এসে তাঁরা জানতে চান ছেলেকে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর সন্ধ্যায় বাড়িতে হামলা চালানো হয়।

হামলার শিকার হওয়া ওই মা আক্ষেপ করে বলেন, “আমার ছেলে অপরাধ করলে তার শাস্তি হোক, আমিও চাই। কিন্তু বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর করল কেন?”

ভুক্তভোগী পরিবারের আরেক নারী জানান, “রাতে ভয়ে ঘুমাতে পারি না। কখন আবার এসে হামলা করে, সেই আতঙ্কে সারা রাত ঘরের ভেতরে আর বাইরে যাই-আসি।”

ভুক্তভোগী পরিবারের এক প্রতিবেশী জানান, ঘটনার পর থেকে গ্রামের মানুষ চরম আতঙ্কে আছেন। তাঁর অভিযোগ, গতকাল দুপুরে এক ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে হুমকি দিয়ে বলেছেন, “আইজ পুলিশ আগরি, কাইল কোনটে যাইমেন (আজ পুলিশ পাহারায়, কাল কোথায় যাবেন)?”

ঘটনাস্থলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম জানান, সেখানে ১২ জন পুলিশ সদস্য পাহারায় নিয়োজিত আছেন। তবে কেউ হুমকি দিয়েছেন এমন কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই এবং আপাতত সেখানে কোনো সমস্যা দেখছেন না তিনি।

পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজমুল হক বলেন, ধর্মকে কটাক্ষ করে তৈরি করা একটি পুরোনো ভিডিও এলাকার দুজনসহ কয়েকজন নতুন করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় উত্তেজনা ছড়ায়। এরপর তিন ভাইয়ের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। ভিডিও ছড়ানো দুজনকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “কেউ অপরাধ করলে আইনে শাস্তির সুযোগ আছে। আইন নিজের হাতে কেউ তুলে নিতে পারে না।” ভবিষ্যতে যাতে সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সোমবার রাতে হামলার পর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি এবং হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আটজনের নাম উল্লেখ করে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার মামলায় একমাত্র আসামিকে ওই দিন রাতেই পুলিশ বগুড়া থেকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় পুলিশ এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন বলেন, পুরোনো ভিডিও নতুন করে ফেসবুকে প্রচারের পর এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়ে তাঁরা সজাগ রয়েছেন।