অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কেবল পুঁজি, প্রযুক্তি কিংবা সরকারি নীতিই যথেষ্ট নয়; বরং মানুষের বয়স এবং জনমিতিক কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা শিশু ও প্রবীণ নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে, তখন উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয়। অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিকে ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

চীন একসময় এই বিশেষ সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে তাদের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছিল। তবে বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যার কাঠামোতে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিহাসে এই প্রথমবার চীনে শিশুদের তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে যে জনমিতিক সুবিধা একসময় চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল, তা এখন দেশটির সামনে নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিবিসি-র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার অর্থ হলো—পেনশনভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়া। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে, জনমিতিক সুবিধা কমে আসার পর চীন কীভাবে তাদের প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখবে।

চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কর্মক্ষম প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ছিল ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৪ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের অনুপাত ছিল ২২ শতাংশ। যদিও সংখ্যার এই ব্যবধান মাত্র ১ শতাংশ পয়েন্ট, তবে এর দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এই পরিবর্তন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির শ্রমবাজার, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া তথ্যমতে, দেশটিতে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা এখন ২২ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ। বিপরীতে, ১৪ বছর বা তার কম বয়সী শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ।

ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের শ্রমশক্তি, করদাতা এবং উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী। তাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ হলো ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের অভাব দেখা দেবে। অন্যদিকে, প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পেনশন, উন্নত চিকিৎসা এবং বিশেষ পরিচর্যার চাহিদা বাড়বে, যা রাষ্ট্র ও সাধারণ পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক স্টুয়ার্ট গিয়েটেল বাস্টেন বিবিসিকে বলেন, “জনসংখ্যার এই পরিবর্তন প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে। এর ফলে সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে। পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে।”

চীনের এই জনমিতিক রূপান্তর একদিনে ঘটেনি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত, দ্রুত নগরায়ণ, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার মতো বিষয়।

১৯৮০ সাল থেকে ২০১৫ সালের শেষ পর্যন্ত চীনে ‘এক সন্তান নীতি’ কার্যকর ছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণ করা। চীন সরকারের দাবি অনুযায়ী, আগে যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, সেই হার বজায় থাকলে বর্তমানের চেয়ে আরও ৪০ কোটি মানুষ বেশি হতো। তবে এই হিসাবটি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে সন্তানের সংখ্যা সীমিত রাখার ফলে নতুন প্রজন্মের আকার ছোট হয়ে গেছে। একই সময়ে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার কারণে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে এবং প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তুলনামূলকভাবে ছোট তরুণ প্রজন্মের ওপর প্রবীণদের দেখাশোনার দায়িত্ব এখন অনেক বেশি।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে চীন সরকার পরবর্তীতে পরিবার গঠনের বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। বেইজিং এখন তরুণদের বিয়ে করতে এবং দম্পতিদের অধিক সন্তান নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছে। তবে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, সন্তান লালন–পালনের খরচ, বাসস্থানের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষার বিস্তার এবং কর্মজীবনের চাপের কারণে জন্মহার আশানুরূপ বাড়ছে না।

প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবীণ সদস্যদের চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যয় মূলত পরিবারগুলোকেই বহন করতে হতে পারে, তবে একই সঙ্গে পেনশন, জনস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়বে।

পেনশন ব্যবস্থার বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে, কারণ সামাজিক সুরক্ষার অনেক কর্মসূচি মূলত কর্মরত মানুষের আয় ও করের ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে এই ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক মু ঝেং মনে করেন, এই জনমিতিক পরিবর্তন চীনের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। শ্রমশক্তি কমে গেলে প্রবৃদ্ধির গতি সীমিত হতে পারে এবং প্রবীণদের দেখাশোনার ব্যয় বাড়লে সাধারণ মানুষের অন্যান্য পণ্য ও সেবায় ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

অবশ্য সরকার প্রবীণদের সহায়তায় ব্যয় বাড়িয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৫ কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবীণ নাগরিক বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় প্রবীণদের সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রবীণ জনসংখ্যার আধিক্যের কথা উঠলে প্রথমেই জাপানের কথা মনে পড়ে। জাপান প্রবীণদের কর্মসংস্থান ও পরিচর্যার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, তবে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা এখনো সীমাবদ্ধ। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ‘পেনশনস অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানে প্রবীণদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ বা তার বেশি। দেশটির প্রবীণদের একটি বড় অংশ এখনো কর্মক্ষম, অর্থাৎ প্রবীণদের কর্মজীবনে ধরে রাখতে জাপান সফল হলেও সবার আর্থিক সচ্ছলতা সমান নয়।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবীণদের প্রায় ৪০ শতাংশ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তবে ‘পেনশনস অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও নরওয়েতে প্রবীণদের আপেক্ষিক দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশের নিচে।

এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বোঝা যায়, প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।

প্রবীণদের সংখ্যা বাড়লে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বাড়লেও এর সাথে নতুন বাজার তৈরি হয়। স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ পরিচর্যা, আবাসন ও সহায়ক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠছে ‘সিলভার ইকোনমি’। চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের মতে, দেশটির অনেক প্রবীণের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি। ফলে তাঁরা কেবল সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগী নন, বরং পণ্য ও সেবার গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতাও। এই বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো চীনের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।