মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পরও বিশ্ববাজারে তেলের দাম টানা ছয় দিন ধরে কমছে। গত জুন মাসের পর থেকে এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজমান করছে। এর মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের প্রস্তুতি চলছে। আজ বুধবার এশিয়ান বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলারে নেমে আসে। ফলে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো দাম কমবে, এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে; গত বছরের আগস্টের পর যা এবারই প্রথম।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমেছে। গত পাঁচ দিনে এই তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। গতকাল মঙ্গলবার তেলের দাম কমার পেছনে সৌদি আরবের এক ঘোষণারও ভূমিকা আছে। দেশটি জানিয়েছে, ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন আবার চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর উপকূল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।

তেলের দাম কমে আসায় চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারও নতুন উচ্চতায় উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আশাবাদের জোয়ারে গতকাল নাসডাক ১০০ সূচক নতুন রেকর্ড গড়েছে।

এর মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে তিন দিনের সম্মেলনের যোগ দিতে ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে চলমান অস্বস্তিকর সমঝোতা বজায় থাকবে, বড় ধরনের অগ্রগতির আশা তেমন একটা নেই।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এভারব্রাইট সিকিউরিটিজ ইন্টারন্যাশনালের কৌশলবিদ কেনি এনজি বলেন, "এই সম্মেলনের ফলাফলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি খাতের প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।"

কেনি এনজি আরও বলেন, "বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখে বিনিয়োগকারীদের অন্ধভাবে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। এ ঘটনায় দুই দেশের নীতিগত অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে।"

বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিএনপি পারিবাস ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এশিয়া অঞ্চলের উপপ্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা গ্রেস ট্যাম বলেন, "তেলের দাম কমে আসায় অক্টোবরে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কমেছে; এখন এ সম্ভাবনা ৫৩ শতাংশ।"

গ্রেস ট্যামের মতে, "বাজার এখনো বিশ্বাস করছে না যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের সমাধান না হলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে কমতে পারে। আবারও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হবে, এমন আশঙ্কা আছে।"

গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকেরা গতকাল এক নোটে বলেছেন, "বছরের শেষ তিন মাসে চীনের তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, এমন সম্ভাবনা কম। চীনের তেল কেনা কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে চাপও কিছুটা কমেছে। বেইজিং এখন কৌশলগত মজুত থেকে তেল ব্যবহার করছে।"

গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকেরা বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ও রপ্তানির অবকাঠামোয় হামলা আরও বাড়তে পারে, এটিই এখন তেলের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। চীনের তেল আমদানি বাড়ার বিষয়টি তাদের কাছে প্রধান ঝুঁকি নয়।"

বুধবার বিশ্ব বন্ডবাজারও মোটামুটি স্থিতিশীল। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার শূন্য দশমিক ০১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ হয়েছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছিল। ফলে বিভিন্ন দেশের বন্ডের সুদের হারও বেড়েছে।

এদিকে শিকাগো ফেডারেল রিজার্ভের প্রেসিডেন্ট অস্টান গুলসবিও চলতি সপ্তাহে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি যে সম্প্রতি বাড়ল, তা যদি শুধু তেলের দাম বাড়ার ধাক্কায় না হয়ে দীর্ঘস্থায়ী অন্য কোনো কারণে হয়ে থাকে, তাহলে ফেডকে দ্রুত ও আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে হবে।"

এক ব্যারেল সমান ১৫৯ লিটার। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলার হলে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের দাম পড়ে প্রায় ৬২ সেন্ট। ডলারের দাম ১২৩ টাকা ধরলে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি লিটারের দাম হয় প্রায় ৭৬ টাকা।

তবে এটি কেবল অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য। এর সঙ্গে পরিবহন, বিমা, বন্দর, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয় আর সরকারের শুল্ক-কর যুক্ত হয়। সব খরচ বিবেচনায় নিয়েই দেশে তেলের চূড়ান্ত বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়।

আরও একটি বিষয় হলো, বাংলাদেশের তেল পরিশোধনের সক্ষমতা সীমিত। দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন তেল পরিশোধন করা যায়। অথচ বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন তেল আমদানি করতে হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়। দেশের বাজারে তেলের দাম নির্ধারণে এই বিষয়টিও বিবেচনা করতে হয়।