টানা চার দিন দরপতনের পর মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম কিছুটা বেড়েছে। সরবরাহ সংক্রান্ত উদ্বেগ কিছুটা কমলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক আলোচনার গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারে প্রভাব ফেলছে। আজ সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০২ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তবে পরে তা কিছুটা কমে ১০১ ডলার ৮০ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআই (WTI) ক্রুডের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
এ সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। গত সপ্তাহের শেষে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংক্রান্ত উদ্বেগ কমেছিল, যা দাম পতনে সহায়ক হয়েছিল। এরপরই আজ দামের সামান্য উত্থান লক্ষ্য করা গেছে।
রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরকে হুমকি দেওয়ার পরিস্থিতিতেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকের জন্য রাজি থাকার কথা জানান। জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে এ সপ্তাহে নিউইয়র্কে আসছেন পেজেশকিয়ান।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, "সাম্প্রতিক দরপতনের পর ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে। একই সময়ে ব্রেন্টের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। তাঁর মতে, বাজারের মূল পরিস্থিতিতে যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, বিষয়টি সে রকম নয়। বরং সাম্প্রতিক দরপতনের পর বিনিয়োগকারীরা তাঁদের অবস্থান কিছুটা সমন্বয় করছেন।" তিনি আরও যোগ করেন, "তেলের দাম আরও কমবে—এমন প্রত্যাশায় যাঁরা তেল বিক্রির পক্ষপাতী ছিলেন, সেই বিনিয়োগকারীরা এখন সেই অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। সে কারণে বাজারে তেলের দাম কমার যে ধারা শুরু হয়েছিল, তা থেমে আজ দাম বেড়েছে। বিষয়টা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা কোন দিকে যায়, তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ঝুঁকি হ্রাস করতে চাইছেন।"
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সপ্তাহের শেষে ইরান আবার আলোচনায় বসার জন্য শর্ত দিয়েছে। প্রতিবেদনে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। ওয়াটারার বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনায় পরিষ্কার অগ্রগতি না হওয়া কিংবা আলোচনা ব্যর্থ না হওয়া পর্যন্ত তেলের দাম নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। এর মধ্যে আবার কিছু ঘটলে তেলের দাম ওঠানামা করবে।"
মধ্যপ্রাচ্যে টান টান উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা জানিয়েছে, তারা রিয়াদ ও ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের উপকূল থেকে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা জোরদার করেছে তারা। হুতিদের হামলা নিয়ন্ত্রণে আনতে চীন তেহরানের সহযোগিতা চেয়েছে। রয়টার্সের তিন ইরানি সূত্রের বরাতে জানা যায়, সম্প্রতি হুতিদের সামরিক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল। এরপর চীন আবার তেহরানকে আহ্বান জানায়, তারা যেন হুতিদের হামলা বন্ধে সহযোগিতা করে।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার পর ইয়ানবু বন্দর দিয়ে কিছু চালান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরামকো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি করেছে। ট্যাংকার চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সাতটি বড় তেলবাহী জাহাজে আরামকোর প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ভরা হয়েছে। সাক্সো ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা এক নোটে বলেন, "হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, ফলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন চালু করার চেষ্টা করছে। অপরিশোধিত তেলের দামে যে অস্থিরতা ছিল, তা কমেছে। তবে বাজারের অস্থিরতা সূচকের মান এখনো ঐতিহাসিক গড় মানের তুলনায় অনেক বেশি।"
এদিকে লিবিয়ায় শরারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরমুখী অপরিশোধিত তেলের পাইপলাইনের ৭ নম্বর ভাল্ভ বন্ধ করে দিয়েছে এক সশস্ত্র গোষ্ঠী। এতে শরারা তেলক্ষেত্রের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, দেশটির ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন এ তথ্য জানিয়েছে। এই তেলক্ষেত্রের উৎপাদন দিনে প্রায় দুই লাখ ব্যারেল কমেছে। রয়টার্সকে দুই প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বর্তমানে সেখানে দিনে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদিত হচ্ছে।
এক ব্যারেল সমান ১৫৯ লিটার। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলার হলে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের দাম পড়ে প্রায় ৬৪ সেন্ট। ডলারের দাম ১২৩ টাকা ধরলে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি লিটারের দাম পড়ে প্রায় ৭৯ টাকা। তবে এটা কেবল অপরিশোধিত তেলের বাজারমূল্য। এর সঙ্গে পরিবহন, বিমা, বন্দর, পরিশোধন, সংরক্ষণ, বিতরণ ব্যয় ও সরকারের শুল্ক-কর যুক্ত হয়। সব খরচ যোগ করে সরকার তেলের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে।
আরও জানা দরকার, বাংলাদেশের তেল পরিশোধনের সক্ষমতা সীমিত, বার্ষিক মাত্র ১৫ লাখ টন। অথচ বছরে আমদানি করতে হয় প্রায় ৭০ লাখ টন। ফলে বিপুল পরিমাণে পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। এতে তেলের দাম অনেক বেশি পড়ে যায়।