বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)-এর সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের ঘনত্ব এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রাক্‌-শিল্পায়নের সময়ের তুলনায় এই বৃদ্ধি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। মানবসভ্যতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের ঘনত্ব প্রতি ১০ লাখ ভাগের ৪২৬.৮ অংশ বা ৪২৬.৮ পিপিএম। এটি প্রাক্‌-শিল্পায়ন সময়ের মাত্রার ১৫৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এই অবিরাম বৃদ্ধি আগামী বছরগুলোতে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে। এ বিষয়ে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল কো ব্যারেট জানান, “আরেকটি বছর মানেই আরেকটি নতুন রেকর্ড। গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো বায়ুমণ্ডলে অভূতপূর্ব তাপ আটকে রাখছে, যা তীব্র চরম আবহাওয়া তৈরি করছে এবং আমাদের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।”

কো ব্যারেট আরও জানান, কার্বন ডাই–অক্সাইডের দীর্ঘস্থায়িত্ব রয়েছে। এটি কেবল আগামী বছরগুলোতে নয়, আগামী কয়েক দশক, এমনকি কয়েক শতাব্দী ধরে জলবায়ুকে প্রভাবিত করবে। নবায়নযোগ্য শক্তি ও নেট জিরো লক্ষ্যমাত্রার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। ১৯৬০–এর দশকে কার্বন ডাই–অক্সাইড বৃদ্ধির গতি ছিল বছরে শূন্য দশমিক ৮ পিপিএম। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের দশকে এই গতি বেড়ে বছরে ২ দশমিক ৪ পিপিএম হয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই–অক্সাইডের গড় ঘনত্ব বেড়েছে ২ দশমিক ৮ পিপিএম।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ওক্সানা তারাসোভা জানান, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ২০২৫ সালে বনের আগুন কমেছে এবং মাটির কার্বন ধারণক্ষমতা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেখা গেছে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং ২০২৬ সালে নতুন করে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে কার্বনের ঘনত্ব আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জলবায়ুর ওপর উষ্ণায়ন প্রভাব ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। এই বৃদ্ধির ৮১ শতাংশই ঘটেছে কেবল কার্বন ডাই–অক্সাইডের কারণে। কার্বনের পাশাপাশি মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মাত্রাও রেকর্ড গড়েছে। বায়ুমণ্ডলে উষ্ণায়ন প্রভাবের ১৬ শতাংশের জন্য দায়ী মিথেন গ্যাসের ঘনত্ব দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪৮ পিপিবি (পার্টস পার বিলিয়ন), যা ১৭৫০ সালের প্রাক্‌-শিল্পায়ন মাত্রার ২৬৭ শতাংশ। নাইট্রাস অক্সাইডের ঘনত্ব দাঁড়িয়েছে ৩৩৯ দশমিক ১ পিপিবি, যা আগের তুলনায় ১২৬ শতাংশ। বিদ্যুতায়নের দিকে বিশ্ব এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সালফার হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাসের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। কার্বনের চেয়ে ২৪ হাজার ৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী এই গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ১০০০ বছরের বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে পারে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিজ্ঞানী জোয়েরি রফেল বলেন, “বায়ুমণ্ডলে জমা হওয়া জলবায়ুদূষণের ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধির গতি আগের দশকের চেয়ে কিছুটা ধীর হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের উল্টো দিকে আমরা হাঁটছি।”

এক্সটার ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল কার্বন সাইকেল বিশেষজ্ঞ পিয়েরে ফ্রিডলিংস্টাইন বলেন, “আসন্ন বছরগুলোতে আমরা প্রাক্‌-শিল্পায়ন সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের সীমা অতিক্রম করব। ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা রাখতে হলে দ্রুত ও গভীরভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো জরুরি। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নেট জিরোতে না নামানো পর্যন্ত এই ধ্বংসাত্মক পরিবর্তন থামবে না।”

প্রিস্টলি সেন্টার ফর ক্লাইমেট ফিউচারসের পরিচালক পিয়ার্স ফরস্টার জানান, ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকে পেছনে ফেলেছে। ডেটাসেন্টার এবং এসির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সেই ঘাটতি নবায়নযোগ্য শক্তি দিয়ে পূরণ করা গেছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জলবায়ু বিপর্যয়ের তীব্র মুখোমুখি হতে হবে।