আমাদের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে শাশুড়ি ও পুত্রবধূর সম্পর্ককে প্রায়শই সংঘাতময় হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক পরিবারেই এই দুই সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে দাম্পত্য জীবনে চরম অশান্তি নেমে আসে, যা একটি সাধারণ সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

অথচ ইসলাম এই সম্পর্কটিকে সংঘাতের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান, মমতা এবং ছাড় দেওয়ার এক অপূর্ব মেলবন্ধন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ইসলাম এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো একপক্ষীয় জুলুম বা অবিচারকে প্রশ্রয় দেয়নি; বরং ‘আদল’ (ন্যায়বিচার) ও ‘ইহসান’ (নৈতিক সৌন্দর্য)–এর চমৎকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা প্রদান করেছে।

সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, বিয়ের পর শ্বশুর-শাশুড়ির যাবতীয় সেবাযত্ন করা পুত্রবধূর জন্য বাধ্যতামূলক বা ফরজ ও ওয়াজিব। কিন্তু ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্ত্রীর মূল দায়িত্ব হলো তার স্বামীর আনুগত্য করা এবং নিজের সন্তানদের লালন-পালন করা। শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করার জন্য স্ত্রীকে আইনগতভাবে বাধ্য করার কোনো সুযোগ স্বামীর নেই।

তবে মনে রাখতে হবে, শ্বশুর-শাশুড়ি হলেন বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবক। একজন মুসলিম নারী যদি ভালোবেসে এবং স্বামীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে স্বেচ্ছায় তাঁর মা-বাবার সেবা করেন, তবে সেটি তাঁর জন্য বিরাট পুণ্যের কাজ এবং উত্তম চরিত্রের পরিচায়ক। এটি পরিবারের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। তবে এই সেবাকে ‘দাসত্ব’ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ।

শাশুড়ি ও পুত্রবধূর সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মাঝে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পড়েন স্বামী। ইসলাম স্বামীকে নির্দেশ দিয়েছে উভয়ের প্রতিই ন্যায়বিচার করতে। স্বামী যেমন তাঁর মায়ের অবাধ্য হতে পারবেন না, তেমনি মায়ের অন্যায় আবদারে স্ত্রীর ওপর জুলুমও করতে পারবেন না।

একজন মেয়ে তাঁর নিজের পরিচিত পরিবেশ ও মা-বাবাকে ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিবেশে আসেন। তাই শাশুড়ির প্রধান দায়িত্ব হলো তাঁকে নিজের মেয়ের মতো আপন করে নেওয়া এবং তাঁর ভুলত্রুটিগুলো মমতার সঙ্গে শুধরে দেওয়া। কথায় কথায় খোঁটা দেওয়া, পিতৃগৃহ নিয়ে কটূক্তি করা বা অহেতুক সন্দেহ করা ইসলামের দৃষ্টিতে মানসিক জুলুম হিসেবে গণ্য।

রাসুল (সা.) ছোটদের প্রতি বয়োজ্যেষ্ঠদের আচরণের একটি সর্বজনীন মাপকাঠি নির্ধারণ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯১৯)

শাশুড়ি যখন তাঁর পুত্রবধূকে কন্যার স্নেহে আগলে রাখবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই পুত্রবধূর অন্তরে তাঁর প্রতি মায়ের মতো শ্রদ্ধা জন্ম নেবে।

যদি শাশুড়ি ও পুত্রবধূর মধ্যে বনিবনা না হয় এবং নিত্যদিন ঝগড়াঝাঁটি হতে থাকে, তবে ইসলামি আইনে স্ত্রীর সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে আলাদা বাসস্থানের দাবি করার। স্বামীর ওপর আইনগতভাবে ওয়াজিব হলো স্ত্রীকে এমন একটি নিরাপদ ও বাধামুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া, যেখানে স্বামী-স্ত্রী ছাড়া পরিবারের অন্য কারও (এমনকি শ্বশুর-শাশুড়িরও) অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ থাকবে না, যাতে স্ত্রীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, জানমালের নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি নিশ্চিত হয়। (আল–ফতোয়া আল–হিন্দিয়া, ১/৫৫৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)

স্ত্রীর এই আইনি অধিকার নিশ্চিত করাকে সমাজে অনেক সময় নেতিবাচক চোখে দেখা হলেও ফিতনা ও পারিবারিক কলহ এড়াতে ইসলাম একে একটি যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

পরিবার হলো শান্তির নীড়। দুজন ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা মানুষের মধ্যে মতের অমিল হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে গিবত (পরনিন্দা), কানকথায় কান দেওয়া এবং ছোট বিষয়কে বড় করে দেখার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)

শাশুড়ি ও পুত্রবধূ উভয়কেই বুঝতে হবে, তাঁদের সম্পর্কটি ক্ষমতার লড়াইয়ের নয়। পরিশেষে শাশুড়ি ও পুত্রবধূর সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতার ওপর। শাশুড়ি যদি পুত্রবধূর কাছে সম্মান ও সেবা প্রত্যাশা করেন, তবে তাঁকে অবশ্যই অভিভাবকসুলভ ভালোবাসা ও উদারতা প্রদর্শন করতে হবে। একইভাবে পুত্রবধূকেও বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে শাশুড়ির প্রতি বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।