প্রাণপ্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার পর্যটকের যে সীমা নির্ধারিত ছিল, সরকার তা বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করেছে। পাশাপাশি পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগও দুই মাস থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চার মাস করা হয়েছে। তবে দ্বীপের সুপেয় পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক প্রাণপ্রকৃতি এই বাড়তি চাপ সহ্য করতে পারবে কি না, তা নির্ধারণে কোনো হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

সেন্ট মার্টিন একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। পরিবেশকর্মীদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে সুপেয় পানির চাহিদার পাশাপাশি পয়োবর্জ্য ও আবর্জনার পরিমাণ বাড়বে এবং সৈকতে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি পাবে। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই চাপগুলো বিবেচনায় নিয়েই কি নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে? তাঁদের দাবি, আগের দুই হাজার পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থাই দ্বীপে গড়ে ওঠেনি; এমতাবস্থায় আরও দেড় হাজার পর্যটক বাড়ানো হলে দ্বীপের প্রাণপ্রকৃতি নতুন ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিনে যেতে পারবেন। প্রত্যেক পর্যটককে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি হিসেবে ১০০ টাকা প্রদান করতে হবে। পর্যটকদের রাতযাপন নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে গত মঙ্গলবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ১ নভেম্বর থেকেই দ্বীপে রাতে অবস্থান করা যাবে। এর আগে শুধুমাত্র ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপনের সুযোগ ছিল।

১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ করা এবং বারবিকিউ করা নিষিদ্ধ। এছাড়া কেয়াবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ রয়েছে। এখন পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি এই নিয়মগুলো কার্যকর করতে নজরদারি কতটা বাড়ানো হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করেছিল। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাস অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপটিতে যাওয়ার সুযোগ পেতেন এবং বছরের বাকি সময় দ্বীপটি প্রায় পর্যটকশূন্য থাকত। গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণ করেছেন, যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এর ফলে পরিবেশগত ইতিবাচক সুফল পাওয়া গেছে বলে মনে করা হয়।

পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। একটি প্রকল্পের আওতায় স্থানীয়দের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল নির্দিষ্টসংখ্যক পরিবারকে দুই মাসের আর্থিক অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এছাড়া সেন্ট মার্টিনের জন্য একটি মহাপরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক ও প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কয়েক দশকের অপরিকল্পিত পর্যটন ও অবাধ স্থাপনা নির্মাণের ফলে সেন্ট মার্টিনের প্রাণপ্রকৃতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্বীপজুড়ে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে ওঠে, যার অনেকগুলোরই পরিবেশ ছাড়পত্র বা অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছিল না। পর্যটকের সংখ্যার কোনো সীমা না থাকায় প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা সৈকত ও আশপাশের সমুদ্রকে দূষিত করে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছে, জাহাজমালিক এবং হোটেল-রিসোর্টের মালিকেরা প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার পর্যটকের সুযোগ চেয়েছিলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সেই সংখ্যা কমিয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত বিষয়ে জানতে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ব্যস্ততার কারণে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাঁর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেনের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় হোয়াটসঅ্যাপ এবং লিখিত প্রশ্নের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

দৈনিক পর্যটকের সীমা একলাফে ৭৫ শতাংশ বাড়ানোয় পরিবেশগত সুফল ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাড়তি পর্যটকের কারণে হোটেল-রিসোর্টে পানির ব্যবহার বাড়বে এবং প্লাস্টিকের বোতল ও খাবারের মোড়কসহ পয়োবর্জ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। বর্জ্য শোধন ও অপসারণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে এই দূষণ সৈকত ও সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়বে, যা প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

পরিবেশকর্মীদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপের ফলে দ্বীপটি উন্নতির দিকে যাচ্ছিল। পর্যটকের আনাগোনা কমায় সৈকতে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কমেছে এবং গবেষণায় সামুদ্রিক পানির মানের উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিনের দূষণ ও মানুষের চাপ থেকে প্রাণপ্রকৃতি কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছিল।

সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একসময় এখানে প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য ছিল, যার মধ্যে প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শৈবাল, শামুক-ঝিনুক ও পরিযায়ী পাখি ছিল। তবে গত দুই দশকে প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে অনেক প্রজাতি হারিয়ে গেছে।

২০২৬ সালের মে মাসে 'জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম'-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন বন্ধ থাকায় সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের উন্নতির লক্ষণ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “দ্বীপের পরিবেশগত বহনক্ষমতা বিবেচনায় দিনে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ পর্যটক যাওয়া যুক্তিসংগত। অথচ সুপেয় পানির সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়িয়েই এবার পর্যটকের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। পর্যটক বাড়ানোর আগে দ্বীপ কতটা চাপ নিতে পারবে, তার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন ছিল।”

প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সংবেদনশীলতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “কক্সবাজারে গণপর্যটনের সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু সেন্ট মার্টিনে একই ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য দ্বীপের প্রাণপ্রকৃতিকে ঝুঁকিতে ফেলা যায় না। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো হলে পরিবেশের ক্ষতিই হবে।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অতীতে পর্যটক ও রাতযাপনের সীমা নির্ধারণে পরিবেশ অধিদপ্তর, সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যুক্ত ছিল। এবার রিসোর্টের মালিক ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনুরোধে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পরিবেশগত বিবেচনায় পর্যটকের সংখ্যা কমতে পারে, বাড়ানোর সুযোগ নেই। তা ছাড়া পর্যটকদের কাছ থেকে আদায় করা ১০০ টাকা কোথায় ব্যয় করা হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।”

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, আগের দুই হাজার পর্যটকের সীমা কার্যকর করতেই প্রশাসনকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। এখন সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের ওপর কার্যকর নজরদারি কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্ন তিনি উত্থাপন করেন।