‘মুরুব্বি, টাকা কই? আমারে ঘুরাইতেছেন ক্যান? ফলাফল সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে?’
রাত বাজে সাড়ে বারোটা। আমার এগারোটার ভেতর বাসায় ফেরার কথা। বাসায় ফেরার কোনো বাস, অটোরিকশা কিছুই পাচ্ছি না। কেউ মোহাম্মদপুরে যেতে রাজি হচ্ছে না।
মগবাজারের এক গলির মুখে ল্যাম্পপোস্টের নিচে একজন বাইকারকে পেয়ে গেলাম। ২৫-২৬ বছর বয়সের তরুণ। মুখভরা আউলাঝাউলা দাড়ি। সে মোহাম্মদপুরে যেতে রাজি হয়েছে। দরদাম করল না। বলল, ‘ওঠেন। যা আছে দেবেন।’
‘যা আছে দেবেন’ মানে বুঝলাম না। তবে বাইকে উঠে বসলাম। ভাঙা একটা হেলমেট দিল পরতে। বাইকার মোহাম্মদপুর পর্যন্ত যাওয়ার ধৈর্য রাখতে পারল না। কাকরাইলের এক শূন্য অন্ধকার গলির ভেতর ঢুকে পড়ল। বাইক থামিয়ে কোমর থেকে ছুরি বের করে বলল, ‘আমি বাইকার না। আমি ছিনতাইকারী। যা আছে বাইর করেন। তাড়াতাড়ি বাইর করেন!’
সঙ্গে সঙ্গে মানিব্যাগ বের করে দিলাম। নোট আর কয়েন মিলিয়ে সেখানে আছে ১৫৬ টাকা। ব্যাংকের ডেবিট কার্ড আছে। আমাকে নিয়ে গেল এটিএম বুথে। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ব্যালান্স দেখাল ৩৪ টাকা। ছিনতাইকারী বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এই নিয়া রাস্তায় নামছেন? বাসায় টাকা নাই?’
খুশি হয়ে, হালকা লাফানোর ভঙ্গিতে বললাম, ‘আছে। বাসায় টাকা আছে। কিন্তু একটা সমস্যাও আছে।’
ছিনতাইকারী বলল, ‘কী সমস্যা?’
‘বাবা, তেত্রিশ বছর ধরে আমিও খুঁজছি। তুমি যদি বের করে দিতে পারো, অর্ধেক টাকা অবশ্যই তোমাকে দেব।’
বললাম, ‘বাবা, আমার বাসায় এক লাখ টাকা আছে। খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি যদি সেই টাকা খুঁজে বের করতে পারো, অর্ধেক তোমার।’
ছেলেটা ছুরি হাতে রেখেই আমার দিকে সরাসরি তাকাল। লাল চোখে বলল, ‘ফাজলামি করেন, মিয়া? বিটলামি ধরছেন। ভুঁড়ি ফাঁসালে জানটাও যাবে।’
কাতর গলায় বললাম, ‘বিশ্বাস না হলে বাসায় চলো।’
ছেলেটা বলল, ‘যাব, তবে বিটলা মুরুব্বি, তোমার বাসায় যাব না। খালপাড়ে গিয়ে তোমাকে জবো দেব।’
মৃত্যু চোখের কাছাকাছি চলে এলে আর মৃত্যুভয় থাকে না। এটা আমার অভিজ্ঞতা। আহ্লাদের সুরে বললাম, ‘বাবা, তোমার নাম কী?’
সে বলল, ‘বাবুল। আমার নাম বাবুল।’
বললাম, ‘বাবা বাবুল, আমার বাসায় চলো। টাকা বাসাতেই আছে। খুঁজে বের করতে পারলেই তোমার নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা।’
বাবুল রাজি হলো। সে আমাকে নিয়ে বাসায় এল। তাকে পুরো বাড়ির নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দিলাম। বাবুল বেডরুমের আলমারি খুলল, বিছানার তলা দেখল, ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ার টানল, এমনকি চালের ড্রামও উল্টে দেখার ব্যবস্থা করল। কোথাও টাকা পাওয়া গেল না।
বাবুল ঘেমেটেমে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ জ্বলছে। কর্কশ গলায় বলল, ‘মুরুব্বি, টাকা কই? আমারে ঘুরাইতেছেন ক্যান? ফলাফল সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে?’
শান্তভাবে বললাম, ‘টাকা আছে।’
বাবুল অধিক শীতল গলায় বলল, ‘টাকা কোথায় আছে?’
বললাম, ‘টাকা আমার স্ত্রীর কাছে আছে।’
অমনি বাবুলের চেহারা বদলে গেল। সে গোড়াকাটা লতানো গাছের মতো নুয়ে গিয়ে বলল, ‘আগে কইলেন না ক্যান? বউয়ের টাকার খোঁজ বাইর করতে পারলে কি আমি ছিনতাই করি!’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘বাবা, তেত্রিশ বছর ধরে আমিও খুঁজছি। তুমি যদি বের করে দিতে পারো, অর্ধেক টাকা অবশ্যই তোমাকে দেব।’
বাবুল কিছু না বলে ছুরি পকেটে ঢুকিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল।
পেছন থেকে বললাম, ‘কী হলো? চেষ্টা করবে না?’
বাবুল দরজার কাছে গিয়ে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘মুরুব্বি, রাস্তায় ছিনতাই করি। বাসায় বাসায় এই ক্যাচাল করার লাইসেন্স অহনো পাই নাই!’
বাবুল বাইকে উঠে স্টার্ট দিল। আমি মনে মনে বললাম, ‘তেত্রিশ বছর! তেত্রিশ বছর কাটল। কেউ কথা রাখেনি। ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল, শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে, তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা এসে চলে গেল, কিন্তু সেই বোষ্টুমী আর এল না।’