ব্যক্তিগত জীবনে এক গভীর শোকের সংবাদ পেলেন আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁর মা ইউলালিয়া মারজেত্তি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। বিশ্বকাপজয়ী এই কারিগরের মায়ের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। এই কঠিন সময়ে স্কালোনি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি।

আর্জেন্টিনার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাতে সান্তা ফে প্রদেশের পুজাতো শহরে ইউলালিয়া মারজেত্তি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বুধবার সকালে স্থানীয় রেডিও স্টেশন 'রেডিও ২'-কে পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। স্কালোনির জন্মস্থান পুজাতোতেই স্বামী আনহেল স্কালোনির সঙ্গে দীর্ঘকাল বসবাস করে আসছিলেন তিনি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে শোক প্রকাশ করে এএফএ। সংস্থাটির সভাপতি ক্লদিও তাপিয়াসহ পুরো আর্জেন্টিনা ফুটবল পরিবারের পক্ষ থেকে স্কালোনি ও তাঁর স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।

এএফএ-র ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের কোচ লিওনেল স্কালোনির মা ইউলালিয়া মারজেত্তির মৃত্যুতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও তাপিয়াসহ সবাই গভীর সমবেদনা জানাচ্ছেন। এই কঠিন সময়ে স্কালোনি ও তার প্রিয়জনদের প্রতি পুরো আর্জেন্টিনার ভালোবাসা ও সহমর্মিতা রইল। শক্ত থাকুন।’

ব্যক্তিগতভাবেও শোকবার্তা পৌঁছে দিয়েছেন এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘প্রিয় গ্রিঙ্গো, তোমার মাকে হারানোর এই কঠিন সময়ে পুরো দেশ তোমাকে ও তোমার পরিবারকে আগলে রেখেছে। আমার গভীর সমবেদনা রইল। তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তোমাদের পাশে আছি। ইউলালিয়া মারজেত্তি শান্তিতে থাকুন।’

আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস ও লা নাসিওনের তথ্যমতে, প্রায় পাঁচ বছর ধরে শারীরিক জটিলতায় ভুগেছিলেন স্কালোনির মা। বিশেষ করে ২০২১ সালে তাঁর স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতি ঘটে। সেই সময় থেকেই মায়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন আর্জেন্টিনা কোচ।

মায়ের অসুস্থতার কথা এর আগেও প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন স্কালোনি। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের পর ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি এই শিরোপা তাঁর মায়ের প্রতি উৎসর্গ করেছিলেন।

সেবার স্বাগতিক ব্রাজিলকে ১-০ গোলে পরাজিত করে দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপাখরা ঘুচিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর স্কালোনি বলেছিলেন, ‘কোপা আমেরিকার এই শিরোপা আমি আমার মাকে উৎসর্গ করতে চাই। কয়েক দিন আগে তিনি গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যায় পড়েছিলেন। এখনো সুস্থ হওয়ার জন্য লড়াই করছেন।’

সেই সময়ে মায়ের পাশাপাশি নিজের পরিবার এবং জন্মস্থান পুজাতোর বাসিন্দাদের প্রতিও ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলেন স্কালোনি। জীবনের অন্যতম বড় সাফল্যের মুহূর্তেও মায়ের অসুস্থতার উদ্বেগ তিনি আড়াল করতে পারেননি।

একই বছরের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে পেরুর বিপক্ষে জয়ের পর আবারও মায়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেন স্কালোনি। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবার মতো মানসিক অবস্থায় তিনি ছিলেন না।

তবে ব্যক্তিগত জীবনের সেই চরম প্রতিকূল সময়েও আর্জেন্টিনাকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যান স্কালোনি। তাঁর কোচিংয়ে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর ২০২২ সালে ফিনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপের শিরোপা জয় করে আলবিসেলেস্তেরা। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর মা-বাবার অবদানের কথা স্মরণ করেছিলেন স্কালোনি। সেদিন তিনি জানিয়েছিলেন, মা-বাবার কাছ থেকেই তিনি হার না মানার শিক্ষা পেয়েছেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরিতে তাঁদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি।

পুজাতোয় দীর্ঘদিন স্থানীয় প্রশাসনের শান্তি বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ইউলালিয়া মারজেত্তি। স্বামী আনহেলের সঙ্গে তিন সন্তান লিওনেল, মাউরো ও কোরিনাকে বড় করেছেন তিনি। স্থানীয় সমাজেও অত্যন্ত পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় মুখ ছিলেন ইউলালিয়া।

তাঁর মেয়ে কোরিনা আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশে 'স্কালা বেকারি' নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। মায়ের মৃত্যুর পর বুধবার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

এদিকে আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মায়ের শেষবিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিজ শহর পুজাতোর উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল স্কালোনির। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের উপস্থিতিতে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়েছে।

পাঁচ বছর আগে কোপা আমেরিকা জয়ের আনন্দের মুহূর্তেও অসুস্থ মায়ের কথা ভুলতে পারেননি স্কালোনি; সেই শিরোপাই উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর প্রতি। বিশ্বকাপসহ একের পর এক সাফল্য এনে দেওয়া আর্জেন্টিনার এই কোচ এবার হারালেন তাঁর জীবনের অন্যতম প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে।