বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দলটিকে পুনরায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারদের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই আবেদনের পক্ষে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক তিনজন বিশেষজ্ঞের নিকট একটি আনুষ্ঠানিক যোগাযোগপত্র জমা দিয়েছেন ব্রিটিশ আইনজীবী স্টিভেন পাওলস কেসি (কিংস কাউন্সেল)।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যম মানবজমিনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ব্রিটিশ আইনজীবীর প্রেরিত ওই যোগাযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসন সর্বপ্রথম আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা কেবল বহালই রাখেনি, বরং সেটিকে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ প্রদান করেছে।
আবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে দলটির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়। ফলে ওই নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক হয়নি বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে এই প্রক্রিয়ার কারণে নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলোকে আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রেখে বাংলাদেশে নির্বাচন আয়োজন করা এবং গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা সুসংহত করার চেষ্টা সাংবিধানিকভাবে অসংগত। এর ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ কার্যত তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের পক্ষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আদালতে এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং এর সমর্থকদের ওপর চলমান হামলার কারণে আইনজীবী নিয়োগ ও আইনি অভিযোগ দায়ের করার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার সরাসরি লঙ্ঘন। এর মধ্যে রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার-সংক্রান্ত ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ, সংগঠন করার স্বাধীনতা-সংক্রান্ত ২২ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকারী ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ।
আবেদনে আরও যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞাটি কোনো যথাযথ আইনি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকারের আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞার কোনো বৈধ উদ্দেশ্য নেই বলেও এতে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সদস্য এবং দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চলমান ধারাবাহিক হামলারই একটি অংশ হিসেবে এই নিষেধাজ্ঞাটিকে বর্ণনা করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ার টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞাটি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত এবং এর অপব্যবহার ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থাও বর্তমানে নেই।
শেখ হাসিনার পক্ষে করা এই আবেদনে জাতিসংঘের তিনজন বিশেষজ্ঞের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। তারা হলেন— সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রসারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার এবং গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রসারবিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ।
আবেদনে ওই বিশেষজ্ঞদের প্রতি দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার এবং বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।