টাকা জমিয়ে শখ করে একটি আইফোন কিনেছিলেন নির্মাণশ্রমিক তারেক মিয়া। কিন্তু সেই দামী ফোনের প্রতি লোভ সামলাতে পারেননি তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী সায়েল মিয়া। শেষ পর্যন্ত বন্ধুকে হত্যা করে আইফোনটি ছিনিয়ে নেন তিনি। পরবর্তীতে সেই ফোনটি বিক্রি করে নতুন জামা এবং একটি সাধারণ বাটনফোন কেনেন সায়েল। নিখোঁজ তারেকের সন্ধানে তল্লাশি চালাতে গিয়ে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা সামনে আসে এবং উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ।
এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে করা মামলায় অভিযুক্ত সায়েল মিয়াকে (২০) গ্রেপ্তার করে আজ বুধবার দুপুরে হবিগঞ্জ আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে তাঁকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করে নবীগঞ্জ থানার পুলিশ।
পুলিশি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সায়েল স্বীকার করেছেন যে, গত ২২ অক্টোবর মধ্যরাতে তিনি কর্মস্থল হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় তাঁর বন্ধু তারেক মিয়াকে (২১) হত্যা করেন। হত্যার পর আইফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে মরদেহটি পাশের একটি ডোবায় ফেলে দেন তিনি।
সায়েল পুলিশকে স্পষ্ট করে বলেছেন, “বন্ধুর আইফোনের প্রতি তাঁর লোভ ছিল। ফোনটি নিজের কবজায় নিতে তারেককে হত্যা করেন। পাশাপাশি আইফোনটি ঘটনার পরদিন সায়েল হবিগঞ্জ শহরের এক ব্যক্তির কাছে মাত্র ৯ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। এ টাকা দিয়ে সায়েল নতুন জামা ও একটি বাটনফোন কিনে বাড়ি ফেরেন।”
নিহত তারেক মিয়া হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার চৌশতপুর গ্রামের মারফত উল্লাহর ছেলে। আর অভিযুক্ত সায়েল একই গ্রামের নুরুজ্জামান মিয়ার ছেলে।
নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বন্ধুর আইফোনের প্রতি তাঁর লোভ ছিল। ফোনটি নিজের কবজায় নিতে তারেককে হত্যা করেন। পাশাপাশি আইফোনটি ঘটনার পরদিন সায়েল হবিগঞ্জ শহরের এক ব্যক্তির কাছে মাত্র ৯ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। এ টাকা দিয়ে সায়েল নতুন জামা ও একটি বাটনফোন কিনে বাড়ি ফেরেন।”
পুলিশ ও মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে একটি নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তারেক মিয়া ও সায়েল মিয়া। একই গ্রামের বাসিন্দা এবং সমবয়সী হওয়ায় তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তাঁরা উভয়েই ওই নির্মাণাধীন ভবনে রাতে অবস্থান করতেন এবং সেখানে তাঁদের বাইরে আর কোনো শ্রমিক ছিলেন না।
সায়েলের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, তারেক সম্প্রতি একটি আইফোন-১১ কিনেছিলেন। ২২ অক্টোবর রাতে কাজ শেষ করে সায়েল ও তারেক মুঠোফোনে গান ও সিনেমা দেখছিলেন। সেই মুহূর্তেই তারেকের আইফোনের প্রতি তীব্র লোভ হয় সায়েলের। ফোনটি কীভাবে নিজের দখলে নেওয়া যায়, সেই ফন্দি আঁটেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই দিন মাঝরাতে একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তারেককে হত্যা করেন সায়েল। এরপর মরদেহটি পাশের একটি কচুরিপানায় ভরা ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়, যাতে লাশটি সহজেই লুকিয়ে রাখা যায়।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পরদিনই সায়েল ঠিকাদারকে জানান যে তিনি আর ওই নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করবেন না। এরপর তিনি বাড়ি চলে যান। সায়েল বাড়ি ফিরলেও তারেক আর ফেরেননি এবং তাঁর মুঠোফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। তারেকের পরিবারের সদস্যরা সায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে জানান যে, তারেক অন্য কাজে কুমিল্লায় চলে গেছেন। এই তথ্যে পরিবারের সদস্যদের মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
পরবর্তীতে তারেকের পরিবারের লোকজন নবীগঞ্জ থানায় একটি নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেই জিডির ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলাকালীন গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে নবীগঞ্জ থানার পুলিশ সায়েলকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। ওই রাতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সায়েল তারেককে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে নবীগঞ্জ ও লাখাই থানার পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ফুলবাড়িয়া গ্রামের ডোবা থেকে তারেকের মরদেহ উদ্ধার করে।
লাখাই থানার ওসি শরীফ আহমেদ জানান, এই ঘটনায় নিহত তারেকের বাবা বাদী হয়ে সায়েল মিয়ার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার সায়েলকে আজ দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহের ময়নাতদন্ত আজ হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে সম্পন্ন হয়েছে।