প্রায় ২৮ বছর আগে প্রবর্তিত হয়েছে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। বর্তমানে দেশে পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রসহ আরও বেশ কিছু সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। তবে সব সঞ্চয়পত্র সাধারণ নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, পরিবার সঞ্চয়পত্র মূলত নারীদের জন্য এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র শুধুমাত্র অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত।

এর বিপরীতে, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রটি দেশের যেকোনো নাগরিক ক্রয় করতে পারেন। এই সঞ্চয়পত্রের বিশেষত্ব হলো এর মুনাফা প্রতি তিন মাস অন্তর উত্তোলন করা যায়। মুনাফার হারও পরিবার ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের কাছাকাছি হওয়ায় একে একটি সর্বজনীন সঞ্চয়পত্র হিসেবে অভিহিত করা যায়।

এই সঞ্চয়পত্রটি কেনার প্রক্রিয়া, যোগ্যতা এবং মুনাফার হার সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো।

আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা ১ লাখ টাকা, ২ লাখ টাকা, ৫ লাখ টাকা ও ১০ লাখ টাকার এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন। সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের পাশাপাশি এটি ভাঙানোর সুবিধাও পাওয়া যাবে জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ডাকঘর থেকে।

এই সঞ্চয়পত্রের মোট মেয়াদ তিন বছর। তবে মেয়াদের আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙালে মুনাফার পরিমাণ হ্রাস পাবে। বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে মুনাফার হার নির্ধারিত হয়। যদি কেউ সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেন এবং তিন বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেন, তবে তিনি ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। তবে মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙালে এই হার কমবে।

অন্যদিকে, সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার হবে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এক্ষেত্রেও মেয়াদের আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙালে মুনাফা কমে যাবে। এছাড়া মেয়াদপূর্তির আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর সময় যদি আগে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তবে তা মূল টাকা থেকে কেটে রাখা হবে।

কর সংক্রান্ত বিষয়ে জানানো হয়েছে যে, আয়কর আইন-২০২৩–এর ১০৫ ধারা অনুযায়ী মুনাফার ওপর অগ্রিম কর কর্তন করা হবে। কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন থাকলে অগ্রিম কর ১০ শতাংশ এবং টিআইএন না থাকলে মুনাফার ১৫ শতাংশ অগ্রিম কর হিসেবে কেটে রাখা হবে। উল্লেখ্য, চলতি বছর থেকে অগ্রিম করের টাকা আয়কর রিটার্ন জমার সময় সমন্বয় করা সম্ভব হবে। কারণ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর যে উৎসে কর কেটে রাখা হতো, তা এখন আর চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য নয়; এবারের বাজেটে এই খাতটিকে চূড়ান্ত করদায়ের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এই সঞ্চয়পত্রটি কেনার যোগ্যতার তালিকা নিম্নরূপ—

১. সব শ্রেণি ও পেশার বাংলাদেশি নাগরিক।

২. আয়কর বিধিমালা, ১৯৮৪ (অংশ-২)–এর বিধি ৪৯-এর উপবিধিতে (২) সংজ্ঞায়িত স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল এবং ভবিষ্য তহবিল আইন, ১৯২৫ (১৯২৫ এর ১৯ নং) অনুযায়ী পরিচালিত ভবিষ্য তহবিল।

৩. আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪–এর ষষ্ঠ তফসিলের পার্ট–এ–এর অনুচ্ছেদ-৩৪ অনুযায়ী মৎস্য খামার, হাঁস-মুরগির খামার, পেলিটেড পোলট্রি ফিডস উৎপাদন, বীজ উৎপাদন, স্থানীয় উৎপাদিত বীজ বিপণন, গবাদিপশুর খামার, দুগ্ধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্যের খামার, ব্যাঙ উৎপাদন খামার, উদ্যান খামার প্রকল্প, রেশম গুটিপোকা পালনের খামার, ছত্রাক উৎপাদন এবং ফল ও লতাপাতার চাষ হতে অর্জিত আয় (যা সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার কর্তৃক প্রত্যয়ন করা)।

৪. অটিস্টিকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অটিস্টিকদের সহায়তার জন্য প্রতিষ্ঠিত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান। তবে শর্ত হলো প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ করা অর্থের মুনাফা অবশ্যই অটিস্টিকদের সহায়তায় ব্যবহার করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে।

৫. দুস্থ ও অনাথ শিশুদের নিবন্ধিত আশ্রয় প্রতিষ্ঠান (অনাথ আশ্রম, শিশু পরিবার, এতিমখানা ইত্যাদি)।

৬. প্রবীণদের জন্য নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্র।

ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান—উভয়ই এই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা নিম্নরূপ:

১. ব্যক্তির ক্ষেত্রে—একক নামে ৩০ লাখ টাকা অথবা যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকা।

২. প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে—ভবিষ্য তহবিলে মোট স্থিতির ৫০ শতাংশ, তবে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা।

৩. ফার্মের ক্ষেত্রে—সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা।

৪. অটিস্টিক সহায়ক প্রতিষ্ঠান, দুস্থ ও অনাথ শিশুদের নিবন্ধিত আশ্রয় প্রতিষ্ঠান (অনাথ আশ্রম, শিশু পরিবার, এতিমখানা ইত্যাদি) এবং প্রবীণদের জন্য নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা।

এই সঞ্চয়পত্রের আরও কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে, যেমন—

১. প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা পাওয়া যায়।

২. নমিনি নিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে।

৩. সঞ্চয়পত্রের ক্রেতার মৃত্যুর পর নমিনি তাৎক্ষণিকভাবে সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করে টাকা উত্তোলন করতে পারেন অথবা মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত যথারীতি প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা উত্তোলন করতে পারেন।

৪. মেয়াদপূর্তির পূর্বে ইস্যু অফিসে যোগাযোগের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পুনঃবিনিয়োগ সুবিধা পাওয়া সম্ভব।