মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও হাঁড়িতে ভাত নেই। এই দুই বিপরীতমুখী সংযোগ একসঙ্গে চালু রাখার সামর্থ্য নেই সাধারণ মানুষের। দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সবাই জানে, তবে তাদের খুঁজে বের করার জন্য যে এত বিশাল আয়োজন প্রয়োজন হয়, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। ‘দরিদ্র খুঁজতেই ২০১০ কোটি’—এমন একটি শিরোনাম দেখে এক দরিদ্র ব্যক্তি নিজের পকেট হাতড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “পকেটে ১০ টাকা নেই, অথচ আমাকে খুঁজতেই এত টাকা! আমি কি দরিদ্র, নাকি হারিয়ে যাওয়া কোনো ভিআইপি?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক ব্যক্তি তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “চুপ! জীবনে প্রথমবার তোর দাম উঠেছে। এত টাকা খরচ করে তোকে খোঁজা হচ্ছে!”
প্রথম ব্যক্তিটি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, “কত দাম?”
তার উত্তর এল, “সেটা জানতে আবার জরিপ হবে।”
পরদিন সেই লোকটির বাড়িতে হাজির হলেন একজন জরিপকারী। তাঁর হাতে ফরম, কাঁধে ব্যাগ এবং মুখে ছিল এক গম্ভীর ভাব। তাঁর চালচলন দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি দরিদ্র মানুষকে খুঁজতে আসেননি, বরং আন্তর্জাতিক কোনো রহস্যের জট খুলতে এসেছেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “আপনার মাসিক আয় কত?”
লোকটি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “কোন মাসের?”
জরিপকারী অবাক হয়ে বললেন, “মানে?”
লোকটি বুঝিয়ে বললেন, “কোনো মাসে কাজ পাই, কোনো মাসে পাই না। যে মাসে পাই, সে মাসেও পুরো টাকা পাই না। আপনি মাস ঠিক করুন, আমি আয় বলি।”
জরিপকারী তখন তাঁর ফরমের দিকে তাকালেন। সেখানে আয়ের জন্য নির্দিষ্ট ঘর থাকলেও, ‘আয় কখনো আসে, কখনো আসে না’—এমন জটিল পরিস্থিতির জন্য কোনো আলাদা ঘর ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি ফরমে লিখলেন, “আয় অনিয়মিত।”
এরপর প্রশ্ন এল, “মাসিক ব্যয়?”
লোকটি উত্তর দিলেন, “আয়ের চেয়ে বেশি।”
“সঞ্চয়?”
“মাসের শেষে ধার।”
জরিপকারী কিছুটা সময় থেমে ফরমে লিখলেন, “দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতা।”
এই কথা শুনে লোকটি বললেন, “দারিদ্র্য তো একটাই—পেটে ভাত নেই। এত মাত্রা যোগ করলে হাঁড়িতে ভাত বাড়বে?”
জরিপকারী কোনো উত্তর দিলেন না, কারণ তাঁর ফরমে এই প্রশ্নের কোনো জায়গা ছিল না। তিনি জানতে চাইলেন, “আপনার মোবাইল আছে?”
লোকটি বললেন, “আছে।”
“স্মার্টফোন?”
“জি।”
লোকটি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত দেখে জরিপকারীর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ইন্টারনেট ব্যবহার করেন?”
লোকটি উত্তর দিলেন, “করি, ফ্রি ওয়াই-ফাই পেলে।”
“নিজে ডেটা কেনেন না?”
“কিনি। তবে ডেটা কেনার পর বাজারে কী কিনব, সেটা নিয়ে একটু সমস্যা হয়।”
জরিপকারী জানতে চাইলেন, “কী সমস্যা?”
লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মোবাইলে ইন্টারনেট থাকে, হাঁড়িতে ভাত থাকে না। দুটো সংযোগ একসঙ্গে চালু রাখার সামর্থ্য নেই।”
জরিপকারী বুঝতে পারলেন যে, ডিজিটাল সংযোগ থাকা আর আর্থিক সচ্ছলতা এক কথা নয়। তিনি আরও প্রশ্ন করলেন, “টেলিভিশন আছে?”
“ছিল। নষ্ট হয়েছে।”
“সারাননি কেন?”
লোকটি বললেন, “সারালে খবর দেখতে পারব। কিন্তু খবর দেখে তো বাজারের বাকি শোধ হবে না।”
এরপর একে একে প্রশ্ন এল— ‘ফ্রিজ?’ উত্তর এল ‘নেই’। ‘বাড়ি?’ উত্তর ‘ভাড়া’। ‘বাড়ির মালিক?’ উত্তর ‘বাড়িওয়ালা’।
সব তথ্য লিপিবদ্ধ করার পর জরিপকারী জানালেন, এবার এই তথ্যগুলো যাচাই করা হবে। লোকটি অবাক হয়ে বললেন, “ঘরে চাল নেই, সেটা আবার যাচাই করবেন কীভাবে?”
জরিপকারী উত্তর দিলেন, “প্রক্রিয়া আছে। আগে তথ্য সংগ্রহ, তারপর যাচাই, বিশ্লেষণ।”
লোকটি বিদ্রূপ করে বললেন, “চাল থাকলে ভাত হতো। এখন চাল নেই, তাই প্রক্রিয়া হজম করছি!”
তিনি আরও বললেন, “ভাই, আমার রান্নাঘরে এসে হাঁড়ির ঢাকনা খুললেই তো হবে। এত শ্রেণিবিন্যাস করলে আমার দারিদ্র্য কি পদোন্নতি পাবে?”
প্রকৃতপক্ষে, দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে সহায়তা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায়। তবে শনাক্ত হওয়ার পর তাঁদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। জরিপকারী তাকে বোঝালেন যে, সবাইকে একইভাবে দরিদ্র বলা যায় না। কেউ দরিদ্র, কেউ অতিদরিদ্র, কেউ ঝুঁকিপূর্ণ, আবার কেউ দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
লোকটি জানতে চাইলেন, “আমি কোন শ্রেণিতে?”
জরিপকারী বললেন, “তথ্য বিশ্লেষণের পর জানা যাবে।”
“আমার ঘরে তিন দিন ধরে চাল নেই। এটা কোন শ্রেণি?”
“সেটাও যাচাই করতে হবে।”
লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমার দারিদ্র্যের ধরন প্রতিদিন একই। শুধু বাজারের দর বদলায়!”
এত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে লোকটির মনে এক চিলতে আশা জাগল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে খুঁজে পেলে কী হবে?”
জরিপকারী জানালেন, “আপনার তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্য বিমোচনের পরিকল্পনা করা হবে।”
“কবে?”
“তথ্য বিশ্লেষণের পর।”
“তারপর?”
“প্রতিবেদন তৈরি হবে, সুপারিশ করা হবে, বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
লোকটি মাথা চুলকে বললেন, “আপনাদের ধাপ এত বেশি যে আমার দারিদ্র্য এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে যেতে যেতেই অবসরে চলে যাবে!”
জরিপকারী মন্তব্য করলেন, “আপনি বিষয়টিকে হাস্যরসের সঙ্গে নিচ্ছেন।”
লোকটি উত্তর দিলেন, “না ভাই, পেটের সঙ্গে নিচ্ছি। পেটকে পরিকল্পনা খাওয়াতে পারি না, প্রতিবেদন খাওয়াতে পারি না। পেট শুধু ভাত চেনে।”
জরিপকারী কলম বন্ধ করলেন, কারণ এই উত্তরের জন্য ফরমে কোনো জায়গা ছিল না। দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা জরুরি, যাতে সহায়তা ভুল মানুষের কাছে না যায়। কিন্তু শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে কী বদল আসবে, সেটিও তো জরুরি।
লোকটি আরও জানতে চাইলেন, “তালিকায় নাম উঠলে দোকানদার কি বাকি দেবে?”
জরিপকারী বললেন, “তা বলতে পারছি না।”
“বাড়িওয়ালা ভাড়া মওকুফ করবেন?”
“সেটা আমার দায়িত্ব নয়।”
“অসুখ হলে চিকিৎসা মিলবে?”
“এটা অন্য বিষয়।”
লোকটি মাথা নেড়ে বললেন, “বুঝেছি। আপনাদের দায়িত্ব আমাকে খুঁজে বের করা, আর আমার দায়িত্ব দারিদ্র্য নিয়ে বেঁচে থাকা!”
জরিপকারী চলে যাওয়ার পর লোকটি দরজায় একটি কাগজ ঝুলিয়ে দিলেন। তাতে লেখা ছিল—
“দরিদ্র মানুষ পাওয়া গেছে। এবার দারিদ্র্যটাকে খুঁজে বের করে বিদায় করুন।”
নিচে আরও লিখলেন—
“আমাকে খুঁজতে ২০১০ কোটি টাকার কথা শুনেছি। এবার জানতে চাই, আমাকে পাওয়ার পর দারিদ্র্য দূর করতে কত লাগবে?”
সবশেষে একটি নোট লিখলেন—
“আমাকে খুঁজে পেতে এত আয়োজন দেখে খুশি হয়েছি। তবে অনুরোধ, আমাকে পাওয়ার পর যেন আবার নতুন জরিপ শুরু না হয়—আমার দারিদ্র্য দূর করতে কত টাকা লাগবে, সেটা জানার জন্য!”