মানবজীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে ইসলামের আদর্শে। জীবনের নানা জটিলতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক অনুসরণ। এই বিষয়ে আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০৮)

দারিদ্র্য কেবল ব্যক্তিগত সংকট নয়, বরং এটি মানুষের মানসিক শান্তি, সামগ্রিক অগ্রগতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার পথে এক বড় বাধা। ইসলাম এই দারিদ্র্য দূর করার জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। এই ঐশী নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা গেলে সমাজ থেকে দারিদ্র্যের অভিশাপ মুছে ফেলা সম্ভব। বিশেষ করে যারা চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন, তাঁদের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা।

এই লক্ষ্য অর্জনে ইসলামে জাকাতব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যা ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম। জাকাত কেবল একটি ফরজ ইবাদত নয়, বরং এটি দারিদ্র্য বিমোচনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। জাকাতের মূল লক্ষ্য হলো ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনা, সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং একটি দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠন করা। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তাদের সম্পদে রয়েছে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের অধিকার।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ১৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) জাকাতের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেন, ‘আল্লাহ তাদের (ধনীদের) সম্পদে জাকাত ফরজ করেছেন, যা ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৯৫)

অনেক দরিদ্র মানুষ জীবনধারণের তাগিদে বা অভাবের কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক হওয়ার কথা বলেছে। তাঁদের ঋণ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণ মওকুফ করার বিধান ইসলামে বিদ্যমান। এমনকি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধে সহায়তা করার জন্য জাকাতের অর্থ দেওয়ারও বিধান রয়েছে (সুরা তাওবা, আয়াত: ৬০)। ঋণ পরিশোধে এই অবকাশ প্রদান দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইসলামের স্পষ্ট বিধান হলো, কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি অসচ্ছল হয়ে পড়েন, তবে তাঁর আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে সময় দিতে হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘কোনো (ঋণগ্রহীতা) ব্যক্তি যদি অসচ্ছল হয়, তবে সচ্ছলতা লাভ করা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিতে হবে। আর যদি সদকা করে দাও, তবে তোমাদের পক্ষে সেটাই অধিকতর শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮০)

এই মানবিক আচরণের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক ব্যক্তির কাছে ফেরেশতা তার প্রাণ হরণের জন্য এসেছিলেন। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তুমি কি কোনো ভালো কাজ করেছ? সে জবাব দিল, আমার জানা নেই। তাকে বলা হলো, একটু চিন্তা করে দেখো। সে বলল, এ বিষয়টি ছাড়া আমার আর কিছুই জানা নেই যে দুনিয়াতে আমি মানুষের সঙ্গে ব্যবসা করতাম, অর্থাৎ ঋণ দিতাম। আর তা আদায়ের জন্য তাদের তাগাদা দিতাম। আদায় করতে না পারলে সচ্ছল ব্যক্তিকে সময় দিতাম, আর অভাবী হলে ক্ষমা করে দিতাম। এ আমলের কারণে আল্লাহ–তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৫১)

দারিদ্র্য বিমোচনের পথে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো দান-সদকা। দান-অনুদান মানবিকতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। এটি কেবল তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটায় না, বরং দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করে। তাই জাকাত ও ফিতরার পাশাপাশি সাধারণ দান-সদকার প্রতি ইসলাম উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর দান-সদকা করা একান্ত জরুরি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০০৮)

পাশাপাশি, জীবিকা অর্জনের একটি পবিত্র ও সম্মানজনক মাধ্যম হিসেবে ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করেছে। ব্যবসা মানুষকে সৎ, পরিশ্রমী এবং আত্মনির্ভরশীল হতে শেখায়, যা আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর করতে সহায়ক। ব্যবসা কেবল অর্থ উপার্জনের পথ নয়, বরং এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তিকে দক্ষ, যুগসচেতন, আত্মবিশ্বাসী ও নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন করে তোলে। এভাবেই ব্যবসা দারিদ্র্য বিমোচনের একটি কার্যকর উপায়ে পরিণত হয়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নামাজ শেষ হয়ে গেলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। আর বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা জুমা, আয়াত ১০)

— লেখক: অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।