পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং অবোধ্য ভাষায় লেখা নথিতে সই করতে বাধ্য করা—এমন চরম জবরদস্তির শিকার হয়ে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে যুদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন বাংলাদেশি তরুণরা। বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কীভাবে এই তরুণদের ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের এক প্রতিবেদনে।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে উন্মুক্ত করা এই প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশসহ মোট ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতারণা ও চাপ প্রয়োগের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মানসিক চাপ ও কৌশলী ফাঁদ
তদন্ত কমিশনের তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রগুলো মূলত ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, প্রান্তিক এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া তরুণদের লক্ষ্য বানাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দালালদের মাধ্যমে তাদের ড্রাইভার, মেকানিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা কারখানার শ্রমিক হিসেবে উচ্চ বেতনের লোভ দেখানো হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য রাশিয়ার বিভিন্ন বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ব্যবহার করে তাদের ব্যবসায়িক ভিসা (Business Visa) করিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজের বদলে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিপত্র।
পাসপোর্ট জিম্মি ও অসহায় পরিস্থিতি
কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাশিয়ায় নামার পর বাংলাদেশি তরুণদের পাসপোর্ট এবং মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়, যাতে তারা বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা সেখান থেকে পালিয়ে যেতে না পারেন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশি এক ভুক্তভোগীর স্ত্রীর জবানবন্দি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “তার স্বামীর পাসপোর্ট জিম্মি করে নিয়ে চুক্তির বিভিন্ন পাতায় সই করতে বলা হয়েছিল। পুরো চুক্তিটি ছিল রুশ ভাষায়, যা তার পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। সে সময় চরম চাপের মুখে তার সই করা ছাড়া কার্যত কোনো বিকল্প ছিল না।”
এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার পরপরই রুশ বাহিনী ওই তরুণদের ইউক্রেন সংঘাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্মুখসারিতে পাঠিয়ে দেয়। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পরিখা খনন এবং রসদ সরবরাহের মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মৃত্যুর মিছিল ও স্বজনদের হাহাকার
জোরপূর্বক যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার ফলে ইতোমধ্যে বহু বাংলাদেশি তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন বছরে এই সংঘাতের কবলে পড়ে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান জানান, “গত দুই বছরে কাজের ও পর্যটক ভিসায় প্রায় সাড়ে আট হাজার বাংলাদেশি রাশিয়ায় গিয়েছেন। তাদের কতজনকে জবরদস্তিমূলক সামরিক চুক্তিতে সই করিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে, কতজন মারা গেছেন কিংবা কতজন নিখোঁজ বা বন্দী আছেন, তা বের করা এখন জরুরি।”
মানবপাচারের প্রমাণ ও পদক্ষেপের আহ্বান
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ‘মানবপাচার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কমিশন রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন অবিলম্বে বাংলাদেশিসহ অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের জোরপূর্বক সামরিক সার্ভিস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত দালাল চক্রকে বিচারের আওতায় আনা হয়। একই সঙ্গে, জবরদস্তির শিকার হয়ে আটকে পড়া তরুণদের উদ্ধার ও মুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।