বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করতে সংযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অপার সম্ভাবনা নিয়ে আজ মঙ্গলবার ঢাকায় ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফআইসিসি) এই বিশেষ আয়োজনের কথা জানা গেছে। বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং চীনের খ্যাতনামা টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ প্রতিপাদ্যের আলোকে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এছাড়া অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা এবং হুয়াওয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, শীর্ষ নির্বাহী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরাও এই আয়োজনে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে কথা বলেন মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য কেবল একটি স্লোগান নয়। এটি বাংলাদেশকে প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্ভাবনমুখী ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। এ জন্য নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি, বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি আমরা। দেশের টেলিযোগাযোগ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের উন্নয়নে হুয়াওয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।’

অন্যদিকে, হুয়াওয়ের দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ বলেন, ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে হুয়াওয়ে সরকার ও শিল্প খাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশে দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশে উৎপাদন ও সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। গত বছর স্থানীয় অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশে ব্যাটারি উৎপাদন শুরু করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে দেশে আরও বেশি টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম উৎপাদন সম্ভব হবে।’

দিনব্যাপী এই আয়োজনে একটি বিশেষ ‘এক্সপেরিয়েন্স জোন’ রাখা হয়েছিল। সেখানে হুয়াওয়ের অত্যাধুনিক স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, স্মার্ট ওয়াচ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোলার সিস্টেম, স্মার্ট ক্লাসরুম, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, ডিজিটাল পাওয়ার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন উদ্ভাবনী সমাধান প্রদর্শিত হয়।

সম্মেলনের অংশ হিসেবে তিনটি পৃথক প্যানেল আলোচনার আয়োজন করা হয়। আলোচনার বিষয়গুলো ছিল— ‘ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও কানেক্টিভিটি’, ‘শিল্প খাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ভূমিকা’ এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বৈশ্বিক প্রবণতা, প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’। এই প্যানেলগুলোর সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ-উল-বারী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওশিন পর্ণিনী এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক মো. তৈয়বুর রহমান।

প্রথম প্যানেল আলোচনায় ‘ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও কানেক্টিভিটি’ বিষয়ে আলোচকেরা মত দেন যে, ডিজিটাল সংযোগকে কেবল ইন্টারনেট বা প্রযুক্তিগত সুবিধা হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, ডিজিটাল সংযোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কতটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা কতটা উপকৃত হচ্ছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধাগুলো মানুষের কাছে কতটা সহজলভ্য হচ্ছে তার ওপর। বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে ডিজিটাল সংযোগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং এর সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।

দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনায় ‘শিল্প খাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ভূমিকা’ বিষয়ে কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। এখানে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ, প্রয়োজনীয় নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, দক্ষ জনবল তৈরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচকেরা মন্তব্য করেন যে, পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি প্রকল্পগুলোকে বাস্তব পর্যায়ে চালু করতে হলে নেতৃত্ব, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং দক্ষ কর্মীর ঘাটতি দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, ফাইবার নেটওয়ার্কের সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

তৃতীয় প্যানেল আলোচনায় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বৈশ্বিক প্রবণতা, প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ বিষয়ে আলোচকেরা জানান, এআই-এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে উন্নত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, ৫জি-র সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি এবং বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় থাকলেও ৫জি সংযোগের পরিধি এখনো সীমিত। আলোচনায় উঠে আসে যে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মাত্র ৫ শতাংশ জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেন, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার ২৫ শতাংশ। সরকারি কাজে তথ্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজস্ব সার্ভারে পরিচালিত এআই মডেল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বাংলা ভাষার তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করা, এআই বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য ও শিল্প খাতে এর কার্যকর ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়। তবে একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনার কথা বলে আলোচকেরা জানান, এআই-এর কারণে কিছু কাজের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে, তাই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের এখন একসঙ্গে কাজ করার সময় এসেছে।

এই প্যানেল আলোচনাগুলোতে অংশ নেন হুয়াওয়ের জেসন উ, টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আসলাম হোসেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলামসহ আরও অনেকে।