ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন উত্তাল ভোটের মাঠ। একদিকে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে সুশাসন ও পরিবর্তনের অঙ্গীকার—এই দুই বিপরীতমুখী ধারায় জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। সাবেক সংসদ সদস্য এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের vacated আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া বিএনপি। অন্যদিকে, চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ ও নতুন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী। যদিও এই উপনির্বাচনে মোট পাঁচ প্রার্থী লড়াই করছেন, তবে অন্য তিন প্রার্থী প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকায় শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার এই দ্বিমুখী লড়াই-ই নির্ধারণ করবে ঠাকুরগাঁওয়ের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ। ইতোমধ্যে এই আসনের প্রচার পর্ব শেষ হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ২১ আগস্ট তিনি শপথ গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের পর ২২ আগস্ট এই আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ১০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন উপনির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করে, যার ফলে আগামী ২৯ অক্টোবর ভোটগ্রহণের কথা নির্ধারিত হয়েছে।

তফশিল অনুযায়ী, এই আসনে পাঁচ দলের পাঁচ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন এবং তাদের মনোনয়ন বৈধ হলে তারা প্রচার কাজ শুরু করেন। প্রার্থীরা হলেন—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মো. দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।

নির্বাচনের শুরু থেকেই দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর উপস্থিতিতে পুরো জেলাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে, চারদিক ছেয়ে গেছে ব্যানার ও ফেস্টুনে। তবে বাকি তিন প্রার্থীর ক্ষেত্রে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি; তাদের কোনো ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং কিংবা সক্রিয় কর্মী দেখা যায়নি ভোটের মাঠে।

স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রুহিয়া উপজেলার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, “হামার তো কপাল, এক বছরত দুইবার এমপি ভোট দিবার পারেছি। ২৯ অক্টোবরের ভোটত প্রার্থী ৫ জনার ২ জনক চিনো-জানো। বাকি ৩ জনাকে চিনো না। ২ জন তো হামার জেলার উন্নয়নের কাথা কহে ভোট চাহাছে। ১ জনাক ভোট দিম। যাতে হামার জেলার উন্নয়ন হয়।”

ভুল্লী উপজেলার রহিমা খাতুন নামের এক নারী জানান, “আমরা চাই আমাদের জেলার উন্নয়ন, রাস্তাঘাট পাকা, বেকারদের কর্মসংস্থান, মেডিকেল কলেজ স্থাপনসহ জেলার মানুষ সব সুযোগ-সুবিধা পাক। দুইজন ভোট চাইতে আসছে। বিএনপি আর জামায়াত ছাড়া আর কেউ আসেনি। এ দুই জনের মধ্যে একজনকে বেছে নিয়ে ভোট দিতে হবে।”

কৃষক সম্প্রদায়ের ক্ষোভ প্রকাশ করে সালন্দর ইউনিয়নের আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “ভোটের আগে প্রার্থীরা নানান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। জেতার পর আর কেউ কথা রাখে না। এবার আমাদের জেলায় সার সংকট, সার পাইনি। অল্প কিছু সার পাইলেও বেশি দাম দিয়ে কিনতে হইছে। কৃষি পণ্যের দাম নেই। আলু, আগাম সবজি সব কিছুতে লস। এইভাবে তো কৃষক বাঁচবে না। আমার মতে যে দল কৃষকের জন্য কাজ করবে তাকে ভোট দিব আমরা। কারণ কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।”

মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পৌরসভা কলেজ পাড়ার বাসিন্দা আলম খান। তিনি বলেন, “আগে আমাদের শহরটা এমন ছিল না। এখন হাত বাড়ালে মাদক পাওয়া যাচ্ছে। যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ২৯ অক্টোবর তো ভোট। দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে এবার খেলা জমবে। দুইজনই মাদক নির্মূলসহ নানান উন্নয়নের কথা বলেছেন। যাকে ভোট দিলে এই সমস্যাগুলো সমাধান হবে তাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে চাই।”

চাঁদাবাজির কবলে পড়া সিএনজি চালক আলম হোসেন বলেন, “আমরা যারা গাড়ি চালায়ে খাই, প্রায় প্রতিদিন আমাদের বিভিন্ন স্ট্যান্ডে চাঁদা দিতে হয়। গ্যাসের দাম বেশি, আগের থেকে ভাড়া কমে গেছে। তাও গাড়ি বের করলে টোলের নামে চাঁদা দিতে হয়। আমরা এর থেকে মুক্তি পেতে যোগ্য এবং ভালো মানুষকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবো।”

বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ আসন থেকেই নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন। পরে ভুল্লী-রুহিয়াকে উপজেলা করেছেন। ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটসহ এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। এসব বরাদ্দ দিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে গেছেন। এখন তার কাজগুলো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমাকে ভোট দিয়ে সাহায্য করুন।”

তিনি আরও বলেন, “আপনারা সবাই কৃষির সঙ্গে জড়িত। আপনাদের এখানে সারের সমস্যা আছে। আমি যদি নির্বাচিত হতে পারি, আমি প্রথম সংসদে গিয়ে আপনাদের এই সারকে খোলা বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করে দেব। এটা করলেই কৃষকের আর কোনো সমস্যা থাকবে না। এলাকাগুলোতে ঘুরেছি, রাস্তাগুলোতে যাওয়া যাচ্ছে না। এ রাস্তাগুলো পাকা করতে হবে। আমি নির্বাচিত হলে রাস্তাগুলো পাকা করে দেব।”

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আপনাদের এলাকার মন্দিরে আলমগীর স্যার ইতোমধ্যে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এরপরে আরও অনেক বরাদ্দ আসবে। হিন্দু-মুসলিম সবাই আমরা মিলেমিশে সুন্দরভাবে থাকতে চাই। আমাদের জীবনকে আরও উন্নত করতে চাই। আমরা নাগরিক সুবিধাগুলো চাই। আমরা এ দেশের নাগরিক। আমরা কারো সঙ্গে কারো ভেদাভেদ রাখবো না।”

মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, মাদক বন্ধ করতে হবে। আর আপনারা যদি আমাকে নির্বাচিত করেন, আমি মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করব। আপনাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে ঠাকুরগাঁওয়ের আগামী ভবিষ্যৎ।”

অন্যদিকে, ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “স্বাধীনতা পরবর্তী বিগত ৫৫ বছরে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে অনেকেই এমপি নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীও হয়েছেন। কিন্তু তারা এমপি-মন্ত্রী হয়ে কেবল নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন। জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ঠাকুরগাঁওবাসী নিজেদের গরু-ছাগল বিক্রি করে রংপুর-দিনাজপুরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। যদি ঠাকুরগাঁওয়ে উন্নত মানের সরকারি হাসপাতাল থাকত, তবে মানুষকে চিকিৎসার জন্য সর্বস্বান্ত হতে হতো না। চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হতো না।”

বেকারত্ব নিরসনে ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ঠাকুরগাঁওয়ের যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিগত এমপি-মন্ত্রীরা কোনো পদক্ষেপ নেননি। ফলে এখানে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার রয়েছেন, যারা সামান্য সহায়তা পেলেই স্বাবলম্বী হতে পারেন। কিন্তু তাদের নিয়ে অতীতের কোনো এমপি-মন্ত্রীর পরিকল্পনা ছিল না।”

নির্বাচিত হলে তার পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে যাতে চিকিৎসার জন্য মানুষকে আর সর্বস্বান্ত হতে না হয়। এছাড়া রুহিয়া ও ভুল্লী উপজেলায় পৃথক মা ও শিশু হাসপাতাল এবং প্রতিটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বেকারত্ব দূর করতে ইপিজেড গড়ে তোলা হবে, বন্ধ বিমানবন্দর চালু করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে এবং ঠাকুরগাঁওকে ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে, যেখানে কোনো দলীয়করণ থাকবে না।

বিএনপি প্রার্থীর সমালোচনা করে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, “রাষ্ট্রপতি জাতীয় নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, তিনি নির্বাচিত হলে ঠাকুরগাঁও থেকে মাদক নির্মূল করবেন। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও ঠাকুরগাঁও থেকে মাদক নির্মূল হয়নি। তিনি বিএনপি প্রার্থীর সমালোচনা করে বলেন, তিনি বলেছিলেন তিনি নির্বাচিত হলে এক দিনের মধ্যে মাদক নির্মূল করবেন। তাহলে প্রশ্ন হলো, বিগত সাত মাসে কেন বিএনপি সরকার ঠাকুরগাঁও থেকে মাদক নির্মূল করতে পারেনি? কারণ, মাদক কারবারি বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে।”

চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ীদের এক পয়সাও চাঁদা দিতে হবে না। ঠাকুরগাঁও হবে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত একটি শান্তির নগরী।”

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কারা হিন্দুদের মামলার ভয় দেখিয়ে ঘরবাড়ি ছাড়া করেছে, কারা মামলা থেকে নাম কাটার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাদের চিনে রাখুন। এরা আবারও নির্বাচিত হলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘুমাতেও বিএনপি নেতাদের চাঁদা দিতে হবে। দাঁড়িপাল্লা বিজয়ী হলে আমি দেলাওয়ার হোসেন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।”

সবশেষে তিনি ঘোষণা করেন, ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি মানুষ নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের এক পয়সাও দুর্নীতি ও তছরুপ হবে না, বরাদ্দ হলে সঙ্গে সঙ্গে জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায়, কীভাবে ব্যয় হয়েছে, সেই হিসাবও জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।”