তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা কোহিনূর আক্তার দস্তখত করা ছাড়া অন্য কিছু লিখতে পারেন না। এমনকি তিনি কখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কার্যালয়েও যাননি। তা সত্ত্বেও তাঁর নাম ব্যবহার করেই নেওয়া হয়েছে ট্রেড লাইসেন্স এবং খোলা হয়েছে ব্যাংক হিসাব। আর সেই হিসাবের মাধ্যমেই বাংলাদেশ রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার চেক জমা দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ উত্তোলন করা হয়।
এত বিপুল অঙ্কের বিল, ব্যাংক হিসাব খোলা কিংবা টাকা উত্তোলনের বিষয়ে কোহিনূর আক্তার সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। এই জালিয়াতির ঘটনায় রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি করা হয়। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর রেলওয়ের হিসাব থেকে ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার একটি চেক ইস্যু করা হয়। ‘দ্য কসমোপলিটন করপোরেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিলের বিপরীতে এই চেকটি দেওয়া হয়েছিল। তবে দুদকের অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিতে ওই বিলের সমর্থনে কোনো প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে চেকের টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়ে বিভিন্ন সময়ে তা তুলে নেওয়া হয়।
দুদকের এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চকবাজার ওয়ার্ডে সরবরাহকারী শ্রেণিতে একটি ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়। সেখানে আবেদনকারী হিসেবে কোহিনূর আক্তারের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই মামলায় রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সীমান্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় রয়েছেন রেলওয়ের সাবেক অডিটর পবন কুমার পালিত, জুনিয়র অডিটর মো. মেহেদী হাসান, খোকন চন্দ্র দে, হিসাব কর্মকর্তা সৈয়দ মো. সাইফুর রহমান, মো. আবু নাছের ও মো. মামুন হোসেন, অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান এবং অস্থায়ী কর্মচারী মো. হাবিবুল্লাহ খান। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞাপন পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপ–কর কর্মকর্তা এম মনজুর উদ্দিন চৌধুরী ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং সীমান্ত ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মো. পারভেজ, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া ও সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ারকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের এজাহারে পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চকবাজার ওয়ার্ডে সরবরাহকারী শ্রেণিতে একটি ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয় এবং আবেদনকারী হিসেবে কোহিনূর আক্তারের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
কোহিনূর আক্তার দুদককে জানান, “আমি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। স্বাক্ষর ছাড়া তেমন কিছু লিখতে পারি না। আমার নামে কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কার্যালয়েও কখনো যাইনি।”
অথচ তাঁর নাম ব্যবহার করেই ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লাইসেন্সের আবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবির মিল নেই। এছাড়া লাইসেন্সে উল্লিখিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানার কোনো অস্তিত্ব সরেজমিনে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, যাঁর নামে ব্যবসার লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে, সেই নারীই লাইসেন্স গ্রহণের বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
ট্রেড লাইসেন্স ও জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় ‘দ্য কসমোপলিটন করপোরেশন’ নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এজাহারে বলা হয়েছে, হিসাব খোলার আবেদনে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এজাহার অনুযায়ী, ওই হিসাব খোলার সময় কোহিনূর আক্তারের পরিচয় ব্যবহার করা হলেও তিনি নিজেই জানিয়েছেন যে তাঁর নামে কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব খোলার নথির এই অসংগতি কীভাবে তৈরি হলো, তা তদন্তে খতিয়ে দেখার বিষয় বলে জানানো হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের (সিসিএস), পাহাড়তলী দপ্তরের সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হয়। এতে ‘দ্য কসমোপলিটন করপোরেশন’-এর নামে তৈরি ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার বিলের পক্ষে প্রয়োজনীয় রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, বিল যাচাই, অনুমোদন ও চেক ইস্যুর বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যথাযথ যাচাই-বাছাই করেননি। ফলে প্রয়োজনীয় নথির সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও সরকারি অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি কথিত সোহাগ আলী ‘দ্য কসমোপলিটন করপোরেশন’-এর কর্মী পরিচয়ে ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার চেকটি সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় জমা দেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ওই হিসাব থেকে টাকা তোলা হয়।