এক সময় গৃহসজ্জার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বেত। বেতের তৈরি চেয়ার, মোড়া, সোফা কিংবা দোলনা কেবল ঘরের সৌন্দর্যই বাড়াত না, বরং আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেও গণ্য হতো। সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত—সব শ্রেণির মানুষের কাছেই ছিল বেতের আসবাবের ব্যাপক চাহিদা। তবে সময়ের আবর্তনে মানুষের রুচি ও জীবনযাত্রায় এসেছে পরিবর্তন। বর্তমানে প্লাস্টিক, বোর্ড এবং আধুনিক উপকরণের আসবাবপত্রের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প।
কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকার একটি বিশেষ জায়গার নাম ‘বেতপট্টি’। এই নামের মধ্যেই মিশে আছে এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। কয়েক দশক আগেও এখানে গড়ে উঠেছিল বেতের আসবাব তৈরির অসংখ্য কারখানা ও দোকান। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কারিগরদের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই প্রাণচঞ্চল চিত্রটি এখন ম্লান হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ওই এলাকায় টিকে আছে মাত্র একটি বেতের আসবাব তৈরির কারখানা। সরেজমিনে দেখা যায়, উক্ত কারখানায় বেতের মোড়া, চেয়ার, সোফাসেট, বইয়ের তাক, ডাইনিং টেবিল, রকিং চেয়ার এবং বিভিন্ন নকশার দোলনা তৈরি করা হচ্ছে। এসব পণ্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আগের মতো চাহিদা না থাকায় বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারখানার মালিক মো. সাঈদ দীর্ঘ সময় ধরে বেতের আসবাব তৈরির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে বর্তমান সময়ে এই ব্যবসা ধরে রাখা তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঁচামালের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং বাজারে সস্তা বিকল্প আসবাবপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ফলে তার ব্যবসা সংকুচিত হয়ে আসছে।
সাঈদের বক্তব্য অনুযায়ী, “বেতের আসবাব তৈরিতে দক্ষ কারিগর ও পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন। প্রতিটি পণ্য নকশা অনুযায়ী হাতে তৈরি করতে হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে কম দামে প্লাস্টিক ও বোর্ডের আসবাব পাওয়া যাওয়ায় ক্রেতাদের একটি অংশ সেদিকে ঝুঁকছেন।”
এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই করছেন কারখানার শ্রমিক মো. মহাসীন, মুক্তার ও বাকেরের মতো দক্ষ কারিগরেরা। তবে বাজারের মন্দাভাব তাদের জীবনসংগ্রামে প্রভাব ফেলেছে। মহাসীনের ভাষায়, “বেতের আসবাব তৈরিতে দক্ষতার পাশাপাশি ধৈর্যও প্রয়োজন। কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে কারিগরদের জীবিকা চলে। কিন্তু অর্ডার কমে গেলে তাদের আয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়।”
আরেক শ্রমিক মুক্তারের মতে, বেতের আসবাব তৈরির কাজ একটি বিশেষ কারিগরি দক্ষতা। তিনি মনে করেন, এই পেশায় নতুন প্রজন্মকে আগ্রহী করে তুলতে হলে কাজের সুযোগ ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা জরুরি।
কারখানার আরেক শ্রমিক বাকের জানান, ঐতিহ্যবাহী এই কাজ টিকিয়ে রাখতে হলে বেতের আসবাবের বাজার ধরে রাখা প্রয়োজন। কাজের সুযোগ কমে গেলে শুধু শ্রমিক নয়, পুরো শিল্পের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেতের কাঁচামালের একটি বড় অংশ আমদানি করা হয় মিয়ানমার, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার বেতের মান উন্নত হলেও দাম তুলনামূলক বেশি। ফলে কাঁচামাল সংগ্রহে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়, যার সাথে যুক্ত হয় কারিগরদের শ্রম ও উৎপাদন খরচ।
বর্তমানে একটি বেতের চেয়ার দুই হাজার থেকে সাত হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোফাসেটের দাম ১৪ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা এবং ছয় আসনের ডাইনিং সেটের দাম ১৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। নকশা, আকার ও মানের ওপর ভিত্তি করে এসব পণ্যের দাম কমবেশি হয়।
অন্যদিকে, প্লাস্টিক ও বোর্ডের তৈরি আসবাবপত্র অনেক কম দামে পাওয়া যায়। ফলে অনেক ক্রেতা দামের কথা বিবেচনা করে বিকল্প পণ্য বেছে নিচ্ছেন। এই তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে ব্যবসায়ীদের নতুন নকশা ও পণ্যের বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
ব্যবহার কমলেও বেতের আসবাবের নান্দনিক আবেদন এখনো অম্লান। স্থানীয় হোটেল মালিক মো. মাইন উদ্দিন তার হোটেলে বেতের আসবাব ব্যবহার করেন। তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, হোটেলের পরিবেশ ও অন্দরসজ্জায় এসব আসবাব এক অনন্য সৌন্দর্য যোগ করে।
শিক্ষক মো. তাজুল ইসলাম নিজের বাসায় বেতের আসবাব ব্যবহার করেন। তার কাছে বেতের আসবাবের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক আসবাবের ভিড়েও কিছু মানুষের এই আগ্রহ এই শিল্পের বাজার ধরে রাখার একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি করে।