খটখট শব্দে একসময় মুখর থাকত কেরানীগঞ্জের রুহিতপুর। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাতের শব্দই ছিল এলাকার পরিচিত সুর। গ্রামের পর গ্রামজুড়ে চলত লুঙ্গি বোনার কাজ। সেই রুহিতপুর আজ অনেকটাই নীরব। শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী হাতে বোনা রুহিতপুরী লুঙ্গি এখন অস্তিত্বের সংকটে।
ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমের এই জনপদ একসময় দেশের অন্যতম তাঁতকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দশক আগেও রামেরকান্দা ও রুহিতপুর এলাকায় তিন হাজারের বেশি তাঁত ছিল। তাঁতশিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবিকা। এখন সেখানে সচল রয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১২টি তাঁত।
সম্প্রতি রুহিতপুরের একটি তাঁতঘর ঘুরে দেখা যায়, ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরের ভেতর কয়েকজন কারিগর লুঙ্গি বুনছেন। একজনের হাতে কাঠের সানা, আরেকজনের হাতে সুতা। দীর্ঘ সময় ধরে একাগ্রতায় চলছে বয়নকাজ। ঘরের বাইরে কেউ সুতায় রং করছেন, কেউ শুকাচ্ছেন, আবার কেউ সুতা প্রস্তুত করছেন। একটি লুঙ্গি তৈরির পেছনে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের শ্রম।
তাঁতি মাহবুব হোসেন প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, একটি থান লুঙ্গি তৈরি করতে দেড় দিনের মতো সময় লাগে। দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেও আয় খুব বেশি হয় না। যে শ্রম দিই, তার তুলনায় পারিশ্রমিক কম।
একই আক্ষেপ আবু হোসেনের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, আমাদের বাবা-দাদারা এই কাজ করতেন। আমরাও করছি। কিন্তু বর্তমান বাজারে এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। নতুন প্রজন্ম আর এই পেশায় আসতে চায় না।
স্থানীয়দের মতে, একসময় একটি পরিবারে কয়েকটি তাঁত থাকত। পরিবারের সদস্যরাই মিলে কাজ করতেন। এখন অনেক ঘরেই তাঁত ভেঙে ফেলা হয়েছে বা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
তাঁতশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুতা, রং ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম কয়েক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি। ফলে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।
রুহিতপুরের তাঁত উদ্যোক্তা শরিফ হোসেন বলেন, আমার পরিবার তিন প্রজন্ম ধরে তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। একসময় এ এলাকায় হাজার হাজার তাঁত ছিল। এখন হাতে গোনা কয়েকটি রয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকায় মানুষ এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছে।
তাঁতিদের আরেকটি অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে যন্ত্রে তৈরি লুঙ্গি ‘রুহিতপুরী লুঙ্গি’ নামে বিক্রি হচ্ছে। এতে প্রকৃত উৎপাদকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
শরিফ হোসেন বলেন, অনেকে রুহিতপুরের নাম ব্যবহার করে বাজারে লুঙ্গি বিক্রি করেন। কিন্তু সেগুলো হাতে বোনা নয়। আসল রুহিতপুরী লুঙ্গির মান ও স্থায়িত্ব আলাদা।
তাঁতিদের দাবি, রুহিতপুরী লুঙ্গির স্বকীয়তা রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ ও বাজার তদারকি প্রয়োজন।
তাঁতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, একটি লুঙ্গি তৈরিতে ১৩ থেকে ১৫টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সুতা প্রস্তুত করা, রং করা, শুকানো, নকশা তৈরি ও বয়ন-সব মিলিয়ে এটি দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। একটি থান লুঙ্গি তৈরিতে প্রায় দুই কেজি সুতা লাগে।
রুহিতপুরের একটি কারখানার ব্যবস্থাপক মো. রফিক বলেন, একটি থান লুঙ্গি তৈরিতে প্রায় তিন হাজার টাকার মতো খরচ হয়। আমাদের কারখানায় মাসে ২৫০ থেকে ৩০০টি লুঙ্গি তৈরি হয়। কিন্তু বাজারব্যবস্থার কারণে উৎপাদকেরা প্রত্যাশিত লাভ পান না।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো রুহিতপুরী লুঙ্গির চাহিদা রয়েছে। এমনকি বিদেশেও এর কিছু বাজার আছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবু উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি ঝুঁকির মুখে।
স্থানীয় তাঁতিরা মনে করেন, সুতা ও কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
রুহিতপুরের প্রবীণ তাঁতিরা বলছেন, তাঁতের খটখট শব্দ শুধু একটি পেশার পরিচয় নয়, এটি একটি জনপদের ইতিহাসও। সেই ইতিহাস যেন হারিয়ে না যায়, এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।