মালাক্কা থেকে পেনাংয়ে যাওয়ার জন্য কোনো অভ্যন্তরীণ বা ডোমেস্টিক ফ্লাইট নেই। এই যাত্রায় হয় কুয়ালালামপুর হয়ে ফ্লাইট ধরতে হয়, অথবা বাস কিংবা ট্যাক্সির সাহায্য নিতে হয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ট্যাক্সিতে করে গন্তব্যের দিকে রওনা হওয়ার।

গভীর রাতের অন্ধকারে গাড়ি এগিয়ে চলল উত্তরের দিকে। পেনাং পৌঁছানোর পথটি বেশ দীর্ঘ, প্রায় পাঁচ শ কিলোমিটার। আমাদের ট্যাক্সিচালক বা সারথি সিম্বে দা জানান, রাস্তার যানজট এবং বিরতির ওপর ভিত্তি করে এই যাত্রায় ছয় ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে। রাতের এই যাত্রায় বাইরের দৃশ্য খুব একটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল না। জানালার ওপারে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর ভেতরে সারাদিনের ভ্রমণের ক্লান্তি। কখন যে রাত পেরিয়ে ভোর হলো, তা আমরা বুঝতেই পারিনি। সকালে পেনাংয়ে পৌঁছে আমরা কোপিতিয়ামে কায়া টোস্ট, আধা সেদ্ধ ডিম এবং কফি দিয়ে সকালের নাশতা সেরে নিলাম।

এরপর আমাদের গন্তব্য ছিল কেক লোক সি মন্দির। সকালের শান্ত পরিবেশে মন্দির দর্শনে এক ধরণের প্রশান্তি ছিল, কারণ তখনো দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়নি। মন্দিরের বিশাল চত্বরে চীনা বৌদ্ধ স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। বাঁকানো ছাদ, রঙিন কারুকাজ এবং বুদ্ধমূর্তিতে সুসজ্জিত প্রার্থনাকক্ষগুলোর মধ্য দিয়ে হাঁটার সময় আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল সাততলা প্যাগোডাটি। চীনা, থাই ও বার্মিজ স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণে তৈরি এই স্থাপনার প্রতিটি স্তরের গঠন আলাদা। আরও ওপরের দিকে দেখা যায় করুণার বোধিসত্ত্ব গুয়ানইনের এক বিশাল ব্রোঞ্জমূর্তি। একই মন্দির চত্বরে এত বৈচিত্র্যময় স্থাপত্যের সহাবস্থান দেখে মনে হচ্ছিল, পেনাংয়ের ইতিহাসে বিভিন্ন সংস্কৃতির যে মেলবন্ধন ঘটেছে, কেক লোক সি যেন তারই এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ।

মন্দির দর্শন শেষ করে সিম্বে দা আমাদের নিয়ে গেলেন তাঁর পরিচিত এক মালয় পরিবারে, যাদের আবাসস্থল এয়ার ইতাম নামক স্থানে। পাহাড়ঘেরা এই জনপদে কৃষিকাজ এবং ফলের বাগানের এক প্রাচীন ঐতিহ্য বিদ্যমান। মালয় পরিবারটির আতিথেয়তা ছিল অতুলনীয়। আমাদের আপ্যায়ন করা হলো গোলাপি পেয়ারা এবং এক ধরণের ভেষজ পাতার পানীয় দিয়ে। পানীয়টির নাম জানা না গেলেও স্বাদ ছিল দারুণ। পরবর্তীতে কলাপাতায় পরিবেশন করা হলো মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার নাসি লেমাক। নারকেলের দুধে রান্না করা সুগন্ধি ভাতের সাথে ছিল সাম্বাল, ডিম, চিনাবাদাম এবং ছোট মাছ। পেনাং শহরকে জানার পাশাপাশি এই মালয় পরিবারের আতিথেয়তা আমাদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর আমরা রওনা দিলাম জর্জ টাউনের উদ্দেশ্যে। আমাদের সাথে যোগ দিলেন ওই মালয় পরিবারের দুজন সদস্য। সকালে মন্দিরে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, বিকেলের দিকে শহর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

১৭৮৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পেনাংয়ে বাণিজ্যিক ঘাঁটি স্থাপন করার পর শহরটির গুরুত্ব ও উপযোগিতা বাড়তে থাকে। বন্দরের আকর্ষণে চীনা ও ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এখানে ভিড় জমান। ফলে মালয় অধিবাসীদের সাথে তাঁদের জীবন ও কাজের এক নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হয়।

তবে বর্তমানের পেনাং বন্দর কেবল পুরোনো জেটি আর পালতোলা জাহাজের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নেই। মালাক্কা প্রণালির পাশে আধুনিক কনটেনার টার্মিনাল, পণ্যবাহী জাহাজ, ফেরি ও ক্রুজ টার্মিনাল মিলিয়ে এটি এখন উত্তর মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। বন্দরের এই কার্যক্রম কেবল জর্জ টাউনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কার্গো টার্মিনালের একটি বড় অংশ মূল ভূখণ্ডের বাটারওয়ার্থ ও প্রাই এলাকায় বিস্তৃত।

পেনাং বন্দরকে শুধু পণ্য আদান-প্রদানের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে। এই দ্বীপে কারা এসেছে, কারা বসতি স্থাপন করেছে এবং কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ একই শহরের অংশ হয়ে উঠেছে—তা এই দীর্ঘ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

পরদিন পেনাংয়ের ফোর্ট কর্নওয়ালিস, চিয়ং ফাট জে ব্লু ম্যানশন এবং ক্ল্যান জেটি দেখার পর আমরা কুয়ালা পেরলিসের দিকে যাত্রা করি। সেখান থেকে ফেরিযোগে আমাদের গন্তব্য ছিল লংকাউই।

মালয়েশিয়া ভ্রমণের শুরু থেকেই ছোটমামা এবং সিম্বেদা আমাদের সাথে ছিলেন। ছোটমামা খুব সাবলীলভাবে মালয় ভাষায় কথা বলতে পারেন, যার ফলে স্থানীয়দের সাথে যোগাযোগ এবং পথঘাট বুঝে নিতে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। তবে কুয়ালা পেরলিসে এসে তাঁদের সাথে আমাদের যাত্রার ইতি টানতে হলো।

মামা এবং সিম্বেদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা লংকাউইগামী যাত্রীবাহী ফেরিতে উঠলাম। মন খারাপ থাকলে দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। মামাকে পেছনে ফেলে এবং পেরলিসের উপকূল ছেড়ে আমরা এগোতে থাকলাম লংকাউইয়ের দিকে। স্থলপথের তুলনায় সমুদ্রযাত্রার এক মৌলিক পার্থক্য রয়েছে; এখানে রাস্তার বাঁক ধরে গন্তব্যে যাওয়া যায় না, বরং জলরাশির বিস্তৃতির মাঝে ধীরে ধীরে দিগন্ত বদলে যেতে থাকে। ঘণ্টা দেড়েক পর আমাদের চোখে পড়ল কুয়াহ বন্দর।

বন্দরে নামার পরপরই আমরা গেলাম ইগল স্কয়ারে। সমুদ্রতীরে অবস্থিত এক বিশাল ভাস্কর্য এটি। লংকাউইয়ের নাম এই ঈগলের কাছেই ঋণী। মালয় ভাষায় ‘হেলাং’ অর্থ ঈগল এবং ‘কাউই’ মানে লালচে-বাদামি রং।

কুয়াহ শহর ঘুরে আমরা বন্দরকেন্দ্রিক জনপদের বাণিজ্যিক রূপটি দেখলাম। এক সময় কুয়াহ ছিল মৎস্যজীবী জেলেদের বসতি। সমুদ্রপথে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় পরবর্তীতে এখানে বন্দরনগরী গড়ে ওঠে। ১৯৮৭ সালে লংকাউইকে শুল্কমুক্ত দ্বীপ ঘোষণা করা হয় এবং তারপর থেকেই পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে কুয়াহ হয়ে ওঠে লংকাউই দ্বীপপুঞ্জের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।

লংকাউইয়ের অসংখ্য দ্বীপের মধ্যে আমরা থাকার জন্য বেছে নিলাম তানজুং রু। কুয়াহতে জনপরিবহন খুব একটা সহজলভ্য নয়, তাই আমরা গ্রাব (Grab) ব্যবহার করে রিসোর্টে পৌঁছালাম। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্রসৈকতের দিকে। লংকাউইয়ের উত্তর প্রান্তে এসে চোখে পড়ল বিস্তৃত বালুকাবেলা, নীল সমুদ্র এবং দূরে নীলাভ জলে ভেসে থাকা ছোট ছোট দ্বীপ।

এই দ্বীপপুঞ্জের শিলা ও ভূপ্রকৃতি পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস ধারণ করে আছে। তানজুং রুসহ উত্তর-পূর্ব লংকাউইয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চুনাপাথরের কার্স্ট দেখা যায়। সমুদ্রে জমে থাকা ক্যালসিয়াম কার্বনেট পলির সাথে মিশে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় এগুলো চুনাপাথরে পরিণত হয়েছে। পরবর্তীতে ভূত্বকের পরিবর্তন, উত্থান এবং জল ও আবহাওয়ার দীর্ঘ ক্ষয়ের ফলে এই শিলাগুলো ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি ধারণ করেছে। কোথাও তৈরি হয়েছে গুহা, কোথাও খাড়া পাহাড়ি দেয়াল, আবার কোথাও সমুদ্রের মাঝে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবলে দৃশ্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চোখের সামনে দৃশ্যমান পাথুরে দ্বীপগুলো যেন প্রাগৈতিহাসিক সময়ের সাক্ষী। দীর্ঘ সময় সমুদ্রতটে কাটিয়ে সন্ধ্যার সূর্যকে বিদায় দিয়ে আমরা ঘরে ফিরলাম। ততক্ষণে রিসোর্টে রাতের খাবার তৈরির প্রস্তুতি শেষ। খাবারের নামগুলো ছিল বেশ চমৎকার—মি গুলং, ইকান বাকর, পেক ঙা। আর সবশেষে ছিল মালয়েশিয়ায় সিগনেচার আইটেম ‘কোকোনাট স্টিকি রাইস’।

রাত কাটল তানজুং রু রিসোর্টে। ঘরের জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যেত। দিনের বেলা সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে যে অসীম বিস্তার দেখেছি, রাতে দেখলাম ঘরের ভেতর থেকে জানালার ফ্রেমে। দেখার জায়গা বদলে গেলেও সমুদ্র রয়ে গিয়েছিল একই, তবে রাতের সেই দৃশ্যটি আলাদা করে মনে গেঁথে থাকল।

পরদিন সকালে লংকাউই স্কাই ব্রিজের পাশ দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম পদাং মাতসিরাত বিমানবন্দরে। কুয়ালালামপুরের উড়ান ধরার আগে দ্বীপটির সাথে আমাদের পরিচয়পর্ব এখানেই শেষ হলো।

অল্প সময়ের ভ্রমণে যতটুকু বুঝেছি, দ্বীপটির ভূপ্রকৃতি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছিল তানজুং রুতে। সমুদ্রে ভেসে থাকা চুনাপাথরের দ্বীপ, পায়ের কাছে নেমে আসা নীল জল আর দীর্ঘ বালুকাবেলা—লংকাউইকে মনে রাখার জন্য এই দৃশ্যটুকুই যথেষ্ট।

*অমৃতা ইশরাত: ব্যাংকার ও লেখক