এসএসসি পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্যের পর রাজশাহী শহরের একটি নামী কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যে কিশোরীর চোখে স্বপ্নের আলো জ্বলে উঠেছিল, চরম অর্থকষ্টে সেই আলো এখন ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে। অভাবের তাড়নায় রুকসানা এখনও বই কিনতে পারেনি, আর শহরে থাকার জন্য কোনো মেসও ঠিক করা সম্ভব হয়নি। বাড়ি থেকে প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করাও তার জন্য দুঃসাধ্য। এই কঠিন পরিস্থিতির মাঝে আড়াই বছর ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত তার মায়ের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও টাকার অভাবে তা করা সম্ভব হয়নি।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার সিংড়া গ্রামের বাসিন্দা মোছা. রুকসানা খাতুন। তার বাবা মো. নূর মোহাম্মদ একজন বৃদ্ধ দিনমজুর এবং মা রাফিয়া বিবি। পাশের এলাকার ধোপাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে রুকসানা। মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ সে রাজশাহী সিটি কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও রুকসানার স্বপ্ন ছিল একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের হাল ধরবে সে। অনেক প্রতিকূলতার মাঝে এসএসসিতে ভালো ফল করলেও কলেজে ভর্তির টাকা জোগাড় করতে পারেনি সে, যার ফলে পুরো পরিবার এক গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। এই খবর জানতে পেরে এগিয়ে আসেন পুঠিয়া উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবুদাস। তাঁর আর্থিক সহযোগিতায় রুকসানা রাজশাহী সিটি কলেজে ভর্তি হতে পারে। তবে সেই কর্মকর্তা বর্তমানে বদলি হয়ে গেছেন।

কিন্তু কেবল কলেজে ভর্তি হওয়া মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। রাজশাহী শহরে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হলে থাকা-খাওয়া, বই-খাতা এবং যাতায়াতের জন্য নিয়মিত খরচের প্রয়োজন। সেই অর্থের সংস্থান কোথায় হবে, তা নিয়ে রুকসানা চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে।

এদিকে রুকসানার মা রাফিয়া বিবির শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। গত ১৮ অক্টোবর তাঁকে পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে দুই দিন থাকার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাতে টাকা না থাকায় তাঁকে সেখানে নেওয়া যায়নি। এমনকি প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই পরিবারের। ফলে নিরুপায় হয়ে বাবা নূর মোহাম্মদ তাঁর মাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন। একদিকে মায়ের জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা, অন্যদিকে রুকসানার ভবিষ্যৎ গড়ার পড়াশোনা—দুটোই এখন অর্থের অভাবে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে রুকসানা মুক্তকণ্ঠকে বলে, “আমার তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদেরও আর্থিক অবস্থা ভালো না। কোনো সহায়তা করতে পারেন না। কিন্তু যেভাবেই হোক আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।”

রুকসানার মেধা ও পারিবারিক দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে ধোপাপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রুকসানার পরিবার খুবই দীন। বসবাস করার মতো ভালো ঘরও নেই। স্কুলে থাকাকালীন তার কোনো বেতন নেওয়া হয়নি। এসএসসির ফরম পূরণের সময়ও তাকে সাহায্য করেছি।” তিনি বিশ্বাস করেন, বিত্তবান কেউ যদি এই মেধাবী মেয়েটির পাশে এসে দাঁড়ান, তবে সে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।