ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষের ঢেউ এখন ইতালির জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, তীব্র আবাসনসংকট, শিক্ষাব্যবস্থার চরম দুরবস্থা এবং সরকারের বিভিন্ন বিতর্কিত নীতির প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার তরুণ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক। গত ১৭ অক্টোবরের সহিংস বিক্ষোভের পর পুনরায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানী রোমসহ মিলান, তুরিন, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সের মতো প্রধান শহরগুলোতে নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এদিন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের তীব্র সংঘর্ষ ঘটে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, আগের সপ্তাহের মতো এবার ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি।

ইতালির জননিরাপত্তা বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে এই বিক্ষোভ, সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় মোট ৪ হাজার ২৯২ জনের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭১ জনকে পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ৮৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশি হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ৬৯ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে।

সাম্প্রতিক এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেন-জির একটি বড় অংশ মনে করছেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ বা মা-বাবার প্রজন্ম যে ধরনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিলেন, বর্তমান প্রজন্ম তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের এই ক্ষোভের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, অনিশ্চিত চাকরির বাজার এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচকে।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মুভিমেন্তো ১৭ অত্তোব্রে’ নামক একটি আন্দোলনের প্রচার শুরু হয়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং বিভিন্ন অনলাইন চ্যাট গ্রুপের মাধ্যমে তরুণদের রাজপথে নামার আহ্বান জানানো হয়। আন্দোলনকারীদের মূল অভিযোগ হলো, ইতালিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি ও বাসাভাড়ার দাম আকাশচুম্বী হলেও সাধারণ মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। বিশেষ করে রোম, মিলান ও বোলোনিয়ার মতো বড় শহরগুলোতে শিক্ষার্থী ও তরুণ চাকরিজীবীদের জন্য আবাসন ব্যয় একটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তবে সব বিক্ষোভ এই একটি আন্দোলনের অংশ নয়; শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী এবং যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলোও পৃথক কর্মসূচি পালন করছে। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না করে সরকার সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধিকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের সংগঠন ‘উনিয়নে দেইলিঁ উনিভেসিতারি’–এর জাতীয় সমন্বয়ক সাবরিনা ব্রিৎসোলা সম্প্রতি এক সমাবেশে নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ ফুটে উঠেছে; শুধু শিক্ষার সুযোগ পেলেই হবে না, সেই শিক্ষা হতে হবে মানসম্মত এবং শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রয়োজন। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস ফিন্টেলমান সিএনএনকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, “ইউরোপের রাজনীতি নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, এমন অনুভূতি থেকেই দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বিক্ষোভে রূপ নিচ্ছে।” তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মজীবনের শুরুর দিকের চাকরিগুলো আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও তরুণদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইতালির এই আন্দোলনের সঙ্গে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের বেশ কিছু মিল লক্ষ্য করা গেছে। দুই দেশেই শিক্ষার মান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ৭ অক্টোবর রোমের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করে এবং তাঁদের প্রকাশিত বিবৃতির শুরুতেই ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানানো হয়। তবে ইতালির সরকার দুই দেশের পরিস্থিতিকে এক করে দেখতে রাজি নয়। চলতি মাসের শুরুতে ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা বলেন, “ইতালির পরিস্থিতি ফ্রান্সের চেয়ে অনেক আলাদা।” অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর দাবি ও অবস্থানের মধ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের কৌশল পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে। তাঁর মতে, শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসন এবং তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির দাবি বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এই বিক্ষোভের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া। ‘১৭ অক্টোবর আন্দোলন’-এর আয়োজকেরা ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের স্থান শেষ মুহূর্তে জানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, যা পুলিশের জন্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরিতে বাড়তি জটিলতা সৃষ্টি করে। এই বিক্ষোভের আগের দিন দেশটির ১৮টি শহরে পুলিশ তল্লাশি অভিযান চালায় এবং আগের সপ্তাহের সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে প্রায় ১০০ জনকে শনাক্ত করা হয়, যাঁদের প্রায় অর্ধেকই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

রাজধানী রোমে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ঐতিহাসিক কলোসিয়ামে প্রবেশ করে। শহরের কেন্দ্রস্থলে কুইরিনালে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছি এলাকায় পুলিশের দিকে বোতল নিক্ষেপের পর সংঘর্ষ শুরু হয়, যা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। উত্তর ইতালির তুরিনে সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রায় চার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশের বাধা অতিক্রমের চেষ্টা ও সংঘর্ষের ঘটনায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়; সেখানে দুজনকে গ্রেপ্তার এবং ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। বোলোনিয়ায় বিক্ষোভকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছে।

ফ্লোরেন্সে বিক্ষোভকারীরা বিলাসবহুল দোকানপাটের এলাকার দিকে অগ্রসর হলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। অন্যদিকে মিলানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ বিক্ষোভে অংশ নিলেও পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সন্ধ্যায় বিভিন্ন মিছিল একত্র হওয়ার পর অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছায়। নাপোলি, পাদোভা ও বারিসহ আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হলেও বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।

এই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত সংগঠন ‘মুভিমেন্তো ১৭ অত্তোব্রে’ বা ‘১৭ অক্টোবর আন্দোলন’-এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩০ বছর বয়সী ইউসেফ সিহেরকে আটক করেছে মিলানের পুলিশ। ইতালির সংবাদমাধ্যম ইল জর্নো জানিয়েছে, মরোক্কান বংশোদ্ভূত ইতালীয় নাগরিক ইউসেফ সিহের একজন সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তদন্তকারীদের ধারণা, সিহের আন্দোলনের ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামভিত্তিক প্রচার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধে উসকানি এবং সন্ত্রাসী উদ্দেশ্যে অপরাধে উসকানির অভিযোগসহ একাধিক তদন্ত চলছে। তাঁকে মিলানের সান ভিত্তোরে কারাগারে নেওয়া হয়েছে এবং ২৬ অক্টোবর বিচারকের সামনে হাজির করার পর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তাঁর স্ত্রী, ৩২ বছর বয়সী লেবানিজ বংশোদ্ভূত সাজিয়া হাম্মুদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগে তদন্ত চলছে।

আন্দোলনের প্রকাশিত ইশতেহার থেকে জানা যায়, সংগঠনটি প্রচলিত রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংগঠনটি নিজেদের কোনো স্থায়ী সভাপতি বা মুখপাত্র ছাড়াই পরিচালিত একটি বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। তবে সংগঠনটির ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থানকে ইতালির সব বিক্ষোভকারীর অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

শুধু তরুণ ও শিক্ষার্থীরাই নন, ইতালির পরিবহন খাতের শ্রমিকরাও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে আন্দোলন করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ইতালিতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ট্রাকচালকেরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহসংকটের কারণে চরম সমস্যার মুখে পড়েছেন। পরিবহন শ্রমিকদের অবরোধের কারণে কিছু এলাকায় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাতেও। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ইতালির অর্থনৈতিক অসন্তোষ এখন শিক্ষার্থী ও তরুণদের বাইরে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও বিস্তৃত হচ্ছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি বিক্ষোভের সময় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ২৪ অক্টোবরের ঘটনার পর তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শনের অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি নাগরিকদের নিরাপদে বসবাসের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি জানিয়েছেন, সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। সরকার বিক্ষোভের আগে বিভিন্ন শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, তল্লাশি এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষস্থলে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং মিলানের কেন্দ্রস্থলে সেনাসদস্যদেরও নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ পুলিশের কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করে অভিযোগ করেছে যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময়ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।

সহিংসতার আশঙ্কায় ইতালির বিভিন্ন শহরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। মিলানে ২৪ অক্টোবর বেশ কিছু দোকান আগেভাগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ত্রিয়েস্তেতে সম্ভাব্য বিক্ষোভের আশঙ্কায় কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দোকানের কাচ কাঠের আবরণ দিয়ে সুরক্ষিত করে এবং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, যদিও সেখানে শেষ পর্যন্ত কোনো বিক্ষোভ হয়নি। ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ ফলমূলের দোকান, মিনিমার্কেট, রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে বড় শহরগুলোর বাণিজ্যিক এলাকায় যাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাঁদের জন্য এ ধরনের অস্থিরতা বাড়তি উদ্বেগের কারণ। দোকান বন্ধ রাখা, ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যাওয়া কিংবা পণ্য পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বাংলাদেশি মালিকানাধীন কোনো দোকানে সরাসরি হামলা বা কোনো বাংলাদেশি নাগরিক আহত হওয়ার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির কোনো নির্দিষ্ট হিসাবও পাওয়া যায়নি। ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের পর পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া ৩৭১ জনের মধ্যে ৬৯ জন বিদেশি নাগরিক থাকলেও তাঁদের জাতীয়তা উল্লেখ না করায় তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। বিক্ষোভে বাংলাদেশিদের সংগঠিত অংশগ্রহণের বিষয়েও কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের পরও আন্দোলন থামানোর কোনো ঘোষণা আসেনি। তুরিনে সামরিকীকরণবিরোধী আন্দোলনের আয়োজকেরা ৩০ অক্টোবর সাধারণ ধর্মঘট উপলক্ষে আবারও রাস্তায় নামার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ২০ নভেম্বর ইতালি ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। একদিকে ইতালির সরকার আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং আবাসনসংকটের সমাধান দাবি করছে। ফলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল রাজপথের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর মধ্য দিয়ে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণ প্রজন্মের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষও সামনে আসছে। এখন দেখার বিষয়, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবিগুলো মোকাবিলায় মেলোনি সরকার কী পদক্ষেপ নেয়।